গণমাধ্যমকর্মীরা জাতির বিবেক। গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ, ‘ফোর্থ স্টেট’ হিসেবে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি অবস্থান করছে। গণমাধ্যমকর্মীদের ক্ষুরধার লেখনি সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল অনিয়ম, অন্যায়, দুর্ণীতি এবং কুসংস্কার কে তুলে ধরে পাঠকের সামনে। এতে করে সমাজের মানুষ সচেতন হয় এবং রাষ্ট্র তার প্রশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে তুলে ধরা ওইসব সমস্যার সমাধান করে।
এজন্য জাতির বিবেক এবং সমাজের দর্পণ হিসেবে ভূমিকা রাখতে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে হতে হয় চৌকস এবং মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন। এছাড়াও প্রয়োজন হয় আরো অনেক কিছুর। বস্তুনিষ্টতা বজায় রেখে সংবাদ প্রকাশ করার পাশাপাশি একজন আদর্শ সাংবাদিকের প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ থাকবে, থাকবে পেশাদারিত্বের মনোভাব, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হবেন তিনি, যেকোন বিষয়কে বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করার যোগ্যতা ও মনোভাব থাকতে হবে, থাকবে সব শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে মেশার দক্ষতা, সংবাদ চেতনা ও সংবাদমূল্য সম্পর্কে ধারণা থাকবে, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী তিনি প্রখর কল্পনাশক্তির অধিকারী হবেন, সহানুভূতিশীল মনোভাব নিয়ে সুশৃঙ্খল ও বিশ্লেষক মনের অধিকারী হয়ে উদ্যমতার সাথে কাজ করবেন।
আমার দেখা এসব গুণাবলী সম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক অরুপ রায়। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে সাংবাদিকতা করে আসছেন। এদেশের প্রতিষ্ঠিত অধিকাংশ প্রথম সারির পত্রিকায় কাজ করেছেন। স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভির শুরুতে মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে খন্ডকালীন কাজ করেছেন সাংবাদিকতায় বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী অরুপ রায়।
মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়ার রাধানগর গ্রামে ১৯৬৫ সালে জন্ম এই মানুষটির। বাবা মৃত উৎপল রায়। সাংবাদিকতার শুরু ১৯৮০ সালে সাপ্তাহিক একতার মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে।
নিজেকে আড়াল করে রাখা এই কলম সৈনিকের সাথে এই প্রতিবেদকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপকালে অনেক কিছু জানা যায়। সাংবাদিকতার শুরুটা এতটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না এখনকার মতো। চারদশক আগে সাপ্তাহিক একতার মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি হয়ে থেমে থাকেননি। নিজের দক্ষতায় এরপর মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন- দৈনিক নব অভিযান, দৈনিক দিনকাল, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, প্রথম আলো ইত্যকার ১ম সারির পত্রিকায়।
এক যুগ আগে চলে আসেন সাভারে। প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং অদ্যবধি এভাবেই কর্মরত রয়েছেন।
সাংবাদিকতার এই দীর্ঘ সময়ে সাংবাদিকতায় অর্জনও অনেক। চারবার হয়েছেন প্রথম আলোর সেরা কর্মী। টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) এর দূর্ণীতি বিরোধী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ২০১৪ ও ২০১৭ সালে শ্রেষ্ঠ অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের পুরস্কার লাভ করেছেন।
সর্বশেষ তথ্য কমিশন থেকে ‘তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’ ২০১৯ সালে শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদকের পুরস্কার লাভ করেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডাঃ মোঃ মুরাদ হাসান এমপি গত ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে ক্রেস্ট ও পুরষ্কারের নগদ অর্থ ১ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন সমসাময়িক সময়ের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিককে।

গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নিজের দক্ষতার পাশাপাশি একজন আলোকিত মানবিক মানুষও বটে অরুপ রায়। নীরবে-নিভৃতে মানবতা প্রদর্শনের দ্বারা আক্ষরিক অর্থেই একজন আলোকিত মানুষ হয়েছেন তিনি। অসহায় কিছু মানুষের জন্য ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি।
মানিকগঞ্জের রিপন বিশ্বাস। পড়াশুনা করতে পারছিল না অর্থের অভাবে। ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য ছিলো না। হয়তো অন্ধকার জীবনে হারিয়ে যেত সে। অরুপ রায় এই রিপন বিশ্বাস এর পড়ালেখা সহ অন্যান্য যাবতীয় খরচ বহন করতে এগিয়ে এলেন। আজ ওই গরীব মেধাবী ছেলেটি একজন এমবিবিএস ডাক্তার।
রেজাউল করিম নামের মানিকগঞ্জের আরেকজনের কথা বলা যেতে পারে। ক্যান্সার আক্রান্ত এই ছেলেটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছে। এর পিছনেও আশীর্বাদের হাত নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অরুপ রায়। এর পড়ালেখা ও সুচিকিৎসার সিংহভাগ নিজে বহন করেছেন। এখনও করছেন এবং ভালো জায়গায় চাকরি পাবার বিষয়েও সহায়তা করছেন তিনি।
মেঘলা নামের মেধাবী এক ছাত্রী ছোট বয়সেই তার বাবাকে হারিয়েছে। মা স্বল্প বেতনে সাভারের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। এভাবেই কোনরকমে চলে তাদের সংসার। এবার অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য সাভার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মেঘলা। ভর্তিযুদ্ধে উত্তীর্ণ হলেও টাকার অভাবে তার পক্ষে ভর্তি হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে গত রবিবার (৫ জানুয়ারি) আর্থিক সহায়তার জন্য মেয়েকে নিয়ে প্রথম আলোর সাভার কার্যালযয়ে এসেছিলেন মেয়েটির মা।

লেখাপড়ার প্রতি মেয়েটির প্রবল আগ্রহ দেখে অরূপ রায় ওই দিনই মেয়েটিকে সাভার গার্লস স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। পাশাপাশি মেয়েটির প্রয়োজনী অন্যান্য শিক্ষা উপকরণও কিনে দেন।
একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিও সাংবাদিক অরুপ রায়। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার রাধানগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তার নিজের জমিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকও ছিলেন তিনি। পরে এটি সরকারীকরণ হয়।
এরকম নানান সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন তিনি। তার বিভিন্ন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প এবং নানান দাতব্য প্রতিষ্ঠানে তার সহায়তার কথা মাত্র একটা প্রতিবেদনে তুলে আনা সম্ভব নয়। তবে একজন আলোকিত মানবিক সাংবাদিক হিসেবে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক অরুপ রায় অন্য গণমাধ্যমকর্মীদের আদর্শ হিসেবে অনুকরণীয় আলোকবর্তিকা তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস