২০০৭ সালের বাগদাদ। পরাক্রমশালী সাদ্দাম হোসেনের পতন হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বিধ্বস্ত শহরের ভৌতিক নীরবতার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ গর্জন ছেড়ে ছুটে চলছে মার্কিন ট্যাঙ্ক আর সাজোয়া জানগুলো। এমন অবস্থার মধ্যে ইরাকে পাড়ি জমান নোয়াখালীর নুরুদ্দিন ওয়াসিম।
মার্কিন সেনাদের ক্যাম্পে কাজ করার জন্যই ইরাকে গিয়েছিলেন তিনি। সাদ্দাম পরবর্তী ইরাকের ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোগুলোর পুনর্গঠন নিজ চোখে দেখেছেন।
‘আমি যখন এই দেশে আসি বাগদাদে তখন কোনো ইরাকিই ছিল না। বলতে গেলে লোকজনই ছিল না, শুধু মার্কিন সেনারা এখানে ছিল।
শহরের কোনো বিল্ডিং আমি তখন অক্ষত দেখিনি। ট্যাঙ্ক চলতে চলতে রাস্তাগুলো লাঙ্গল দিয়ে চাষ করা জমির মতো হয়ে গিয়েছিল। চারদিকে শুধু গুলি আর বোমার চিহ্ন। হামলায় বিধ্বস্ত লাখ লাখ গাড়ির স্তূপ ছিল মাইলের পর মাইলজুড়ে,’ বলছিলেন নুরুদ্দিন।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পালাবদল, গৃহযুদ্ধ সইতে হয়েছে ইরাককে। যা এখনো শেষ হয়নি। শরণার্থী ক্যাম্পগুলো থেকে আবারও শহরগুলোতে ফিরেছেন নগরবাসী। অনেক অফিস আদালত, বাজার-ঘাট আগের মতো চলছে।
নুরুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ থেকে পরে যারা ইরাকে এসেছে তাদের অনেকে উপলব্ধিই করতে পারবেন না দেশটা কেমন ছিল ওই সময়। এমনকি অনেক ইরাকিও যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়েই পালিয়ে গিয়েছিলেন। তারাও জানেন না শহরটা কেমন ছিল।
নুরুদ্দিন যখন দেশটিতে যান তখন সেখানে সেভাবে সরকার ব্যবস্থায় ছিল না। মার্কিন ক্যাম্পে কাজ করতে করতে পরবর্তীতে শেখ সাদুন নামে ইরাকের এক রাজনৈতিক নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয় নুরুদ্দিনের।
তার মাধ্যমেই বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ডেন্টিস্ট্রির অধ্যাপক ফাখরি আল-ফালাবির চেম্বারে কাজ পান। কিন্তু ওই মন্ত্রী পরে এক গাড়িবোমা হামলায় মারা যান। দুই বছর এ দন্ত চিকিৎসকের সঙ্গে থাকার পর বর্তমানে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন নুরুদ্দিন।
তেল সম্পদ কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ইরাক। কিন্তু অস্থিরতা কিছুতেই কাটছে না। সরকারবিরোধী বিক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া নতুন উত্তেজনায় ঘি ঢেলে দিয়েছে মার্কিন হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির হত্যার ঘটনা।
এ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে দেশটিতে। সেখানে নুরুদ্দিনের মতো আরও অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করছেন। কেমন আছেন তারা? জানতে চাইলে নুরুদ্দিন বলেন, ‘আমারা আসলে যেখানে কাজ করি সেখানে কোনো সমস্যা নেই।’
তিনি জানান, এখানে সব বাংলাদেশির বৈধ কাগজপত্র নেই। তিনি নিজেই গত সাত আট বছর বৈধভাবে সেখানে আছেন। তার আগে কোনো কাগজ-পত্র ছিল না। শুধু বাংলাদেশিই না, প্রবাসী যারাই আছে তাদের কর্মক্ষেত্রের বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই।
অর্থাৎ বিশেষ প্রয়োজনে আশপাশে যেতে পারেন কিন্তু শহরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। কেউ যদি অন্য কোনো শহরে যায় তাহলে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করবে।
গত শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) ইরাকের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকদের সতর্ক থাকতে অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ দূতাবাস। কর্মস্থল ও বাসস্থান ছাড়া অন্য কোথাও যত্রতত্র ঘোরাফেরা না করারও পরামর্শ দেয়া হয়। প্রবাসীদের কন্স্যুলার সেবা প্রদানের জন্য সপ্তাহে ৭দিনই ২৪ ঘণ্টা বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা থাকবে বলেও জানানো হয়।
নুরুদ্দিন বলেন, এখানে যখন কোনো ঝামেলা হয় তখন বাইরে যাওয়া নিরাপদ না। এটা শুধু বাংলাদেশি কিংবা প্রবাসীদের জন্য না, সবার জন্যই। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইরাকিরাও বাইরে নিরাপদ অনুভব করে না।
নুরুদ্দিন ডাক্তারের যে চেম্বারে কাজ করেন সেটি বাগদাদের সাদুল এলাকায়। চেম্বারটি এবং গ্রিন জোনের মধ্যে কেবল আবু নাস পার্কটি। এই গ্রিন জোনেই মার্কিন দূতাবাস অবস্থিত। এই এলাকায় নিরাপদ বোধ করেন কিনা জানতে চাইলে নুরুদ্দিন বলেন, আমরা আমাদের কাজেই থাকি।
অপ্রয়োজনে বাইরে না গেলেই আর কোনো সমস্যা নেই। বাইরে যে হামলাগুলো হয়, ইরাকি নাকি বিদেশি বাছাই করে তো আর হামলা চালানো হয় না। আসলে যেসব এলাকায় মার্কিনীরা এবং যেসব এলাকায় ইরানিরা থাকেন সেই জায়গাগুলো তুলনামূলক অনিরাপদ। বাকি জায়গাগুলোতে তেমন সমস্যা নেই। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ইরাকে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের কাজে কিংবা আয় রোজগারে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
নুরুদ্দিন বলেন, এখানে কলকারখানা কম। যেগুলো আছে তাতে বাংলাদেশিরা তেমন কাজ করে না। বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই বিভিন্ন অফিস এবং দোকানপাটে কাজ করেন। তারা বেতন ঠিকমতোই পান। দোকানে বিক্রি হোক না হোক তাতে সমস্যা নেই। বাংলাদেশিরা যে বেতন পান তা দিতে এদের কোনো সমস্যা হয় না।
বার্তাবাজার/কেএ