ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ৮০টিরও বেশি শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে। এ দিকে আক্রান্ত হলে ইরানের ৫২টি স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প। প্রতিক্রিয়ায় ইরানে হামলা চালানোর সাহস মার্কিনিদের নেই বলে দাবি করেছেন ইরানি সেনাপ্রধান।
আইআরজিসির সিনিয়র কমান্ডার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি স্থাপনা টার্গেটে রেখেছে ইরান। এ দিকে আবার গোপনে সমঝোতা চেষ্টার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ইরান যাতে সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ না নেয়, সে জন্য তেহরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর আলজাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, মিরর, ডেইলি সাবাহ ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
গত শুক্রবার ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরে রকেট হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ সেনাকর্মকর্তা ও কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। তাকে ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি বলে মনে করা হতো। রোববার খুব সকালে ইরাক থেকে তার লাশ ইরানে পৌঁছানোর সাথে সাথে মানুষের বাঁধভাঙা ঢল নামে রাজপথে। আগামীকাল তাকে তার নিজ শহর কেরমানে দাফন করা হবে। শনিবার ইরাকে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও অংশ নিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ৬২ বছর বয়সী সোলাইমানি মার্কিন কূটনীতিক ও নাগরিকদের ওপর শিগগিরই মারাত্মক হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। ইরান এই দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে বললেও এ নিয়ে কোনো দলিল প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ওই হামলার চরম প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
তেহরান আমেরিকানদের ওপর বা মার্কিন সম্পদের ওপর হামলা চালালে ইরানের ৫২টি লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব দ্রুত ও অত্যন্ত কঠিন’ হামলা চালাবে বলে হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওই ৫২টি লক্ষ্য বাছাই করে রেখেছে বলে শনিবার জানিয়েছেন তিনি। জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ‘নির্দিষ্ট মার্কিন সম্পদে হামলা চালানোর বিষয়ে ইরান খুব নির্ভয়ে কথা বলছে’ বলে এক টুইটে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ৫২টি লক্ষ্যস্থল নির্ধারণ করেছে, এগুলোর মধ্যে কিছু ইরান ও ইরানের সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উঁচু স্তরের। আর ওই লক্ষ্যস্থলগুলোতে ও ইরানে খুব দ্রুত ও অত্যন্ত কঠিনভাবে আঘাত হানা হবে।’ ‘যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো হুমকি প্রত্যাশা করে না’ বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এই টুইটের কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হয়। নিজেদের ‘ইরান সাইবার সিকিউরিটি গ্রুপ হ্যাকার্স’ বলে পরিচয় দেয়া এক গোষ্ঠী ওই ওয়েবসাইট হ্যাক করার দাবি করেছে। আমেরিকান ফেডারেল ডিপোজিটোরি লাইব্রেরি প্রোগ্রামের সাইটে পাঠানো বার্তায় লেখা ছিল, ‘এটি ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বার্তা’। ‘এই অঞ্চলে আমাদের বন্ধুদের সমর্থন দেয়া বন্ধ করব না আমরা : ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনতা, ইয়েমেনের নিপীড়িত জনতা, সিরিয়ার জনতা ও সরকার, ইরাকের জনতা ও সরকার, বাহরাইনের নিপীড়িত জনতা, লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রকৃত মুজাহিদিন প্রতিরোধ, সবসময় আমাদের সমর্থন পাবে।’ ওয়েবপেজটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি বিকৃত ছবিও দেয়া হয়েছে, তাতে ট্রাম্পকে মুখমণ্ডলে আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখানো হয়েছে যেখানে তার মুখ থেকে রক্তপাত হচ্ছে। ‘এটি ইরানের সাইবার সক্ষমতার একটি ক্ষুদ্র নমুনা,’ লিখেছে হ্যাকাররা।
জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো বিমান হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা পাঠানোর প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছেন বিক্ষোভকারীরা। ওয়াশিংটনসহ বেশ কয়েকটি বড় শহরের বিক্ষোভ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার আহবান জানানো হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮০টি স্থানে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরোধী জোট অ্যাক্ট নাউ টু স্টপ ওয়ার অ্যান্ড রেসিজম এর আয়োজন করে। তাদের সাথে যোগ দেয় আরো বেশ কয়েকটি সংস্থা। বিক্ষোভ হয়েছে হোয়াইট হাউজের বাইরে, নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার, শিকাগোর ট্রাম্প টাওয়ারের বাইরেও। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জার্মানির বার্লিন শহরের ব্রান্ডেনবার্গ গেটেও বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে স্লোগান উঠেছে ‘ন্যায়বিচার নেই, শান্তি নেই, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ো’।
একটি বিক্ষোভে যোগ দেন ৬৬ বছর বয়সী স্যাম ক্রুক। তার হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘মনোযোগ ঘোরানোর দরকার? যুদ্ধ শুরু করুন’। ইউক্রেন কেলেঙ্কারিতে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা শুরু করায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই দেশ এখন এমন একজনের হাতে যিনি মানসিকভাবে সুস্থ নন, আমার মনে হয় সেটা ডোনাল্ড ট্রাম্পই। তার মাথা এখন ঠিক নেই।’
ওয়াশিংটনের বিক্ষোভে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, পেন্টাগনের নথি ফাঁস করে দেয়া হুইসেলব্লোয়ার ড্যানিয়েল এলসবার্গ ও অভিনেত্রী জেন ফন্ডে। গত বছর জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী এক সমাবেশের সময় ইউএস ক্যাপিটল হিলের সিঁড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ফন্ডে বলেন, ‘এখানে উপস্থিত তরুণদের বলছি, তোমাদের জন্মের পর যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে তার সবই হয়েছে তেলের জন্য। তেলের কারণে আমরা আর মানুষের প্রাণ ও পরিবেশ নষ্ট করতে দিতে পারি না।’
মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় একই ধরনের এক সমাবেশে প্রতিবাদকারী স্টিভ লেন বলেন, ‘মিছিলে যোগ দিলে খুব বেশি কিছু করা হয় এমন না, কিন্তু অন্তত আমি বাইরে বের হয়ে বলতে পারি যে, আমি এই বিষয়গুলোর বিরোধিতা করছি। সম্ভবত যদি অনেক লোক একই কাজ করে, তখন তিনি (ট্রাম্প) শুনবেন।’
ইরানের টার্গেটে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ৩৫ স্থাপনা : ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ ৩৫টি স্থাপনা টার্গেটে রেখেছে ইরান। আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ এক কমান্ডার এ কথা জানিয়েছেন বলে খবর প্রকাশ করেছে দ্য মিরর। খবরে বলা হয়, আইআরজিসি কমান্ডার গোলাম আলী আবু হামজাহ বলেছেন, ওই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান টার্গেটগুলো অনেক আগেই ইরান চিহ্নিত করে রেখেছে। তবে কোনো বিশেষ টার্গেটের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫টি স্থাপনা, এমনকি তেল আবিব (ইসরাইলের) আমাদের হামলার আওতায়।
এর আগে মার্কিন হামলায় জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিশোধের ইঙ্গিত জানিয়ে মসজিদের চূড়ায় ‘যুদ্ধপতাকা’ উড়িয়েছে ইরান। শনিবার ইরানের কোম প্রদেশের পবিত্র মসজিদ জামকারানের সর্বোচ্চ গম্বুজে রক্তলাল পতাকা ওড়ায় ইরান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ইরান জামকারান মসজিদে রক্তলাল পতাকা ওড়ালো। এই পতাকা ওড়ানোকে সোলাইমানি হত্যার দায়ে আমেরিকার ওপর ইরানের বদলা নেয়ার অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব ট্রাম্পের : তুরস্কের ইংরেজি দৈনিক সাবাহ জানিয়েছে, ইরান যাতে সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ না নেয় সে জন্য, তেহরানের ওপর আরোপিত সবধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন আমির আল-মুসাভি নামের সাবেক এক ইরানি কূটনীতিক।
এক সাক্ষাৎকারে আমির আল-মুসাভি জানিয়েছেন, ইরান যদি সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ না নেয় তাহলে তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানকে সহায়তারও প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিনিরা। একজন আরব মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আমির আল-মুসাভি। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইরানের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। আমি মনে করি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব ইরানের ক্ষোভ প্রশমিত করবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত যত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার কোনোটিই বাস্তবায়ন করেনি।
হরমুজ প্রণালীতে ফের যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে ব্রিটেন : পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ পতাকাবাহী তেলের ট্যাংকারকে সুরক্ষা দিতে সেখানে মোতায়েন করা হচ্ছে ব্রিটিশ দু’টি যুদ্ধজাহাজ। এ ছাড়া ওই এলাকায় টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন মোতায়েন রয়েছে। এমন অবস্থায় মাসটিকে অবকাশ যাপন শেষে দেশে ব্রিটেনে ফেরার কথা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের।
তিনি এখনো মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট উত্তেজনায় মুখ খোলেননি। গত জুলাই ও নভেম্বরে ব্রিটেনের তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছিল ইরান। ওই সময়ও ব্রিটিশ তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে একইভাবে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল।
মার্কিন সেনা সরিয়ে নেয়ার খসড়া বিলে ১৭০ ইরাকি এমপির সই : মার্কিন বিমান হামলায় শুক্রবার ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি ও হাশদ আশ শাবির সেকেন্ড ইন কমান্ড আবু মাহদি আল মুহানদিস নিহত হওয়ার দু’দিন পরই এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো।
সংসদের জরুরি অধিবেশন ডাকেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান আদিল আবদুল মাহদি। জরুরি বৈঠকে পার্লামেন্ট সদস্যরা ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তাব দেয়ার পক্ষে মত দেন।
সংসদের আইনবিষয়ক কমিটির প্রধান আমার আল শিবলি বলেন, ‘আইএস-কে পরাজিত করার পর মার্কিন সেনাদের এখন আর প্রয়োজন নেই। দেশ রক্ষায় আমাদের সশস্ত্রবাহিনী আছে।’
এখনো ইরাকে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। নিরাপত্তা চুক্তি অনুযায়ী তাদের পরামর্শমূলক কাজে জড়িত থাকার কথা থাকলেও খোদ ইরাকি বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ইরাকিরা।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস