লাউয়াছড়া বনের পাশেই চাউতলী বনাঞ্চল। পরিবেশবিদদের আপত্তির মুখে ৬ হাজার ৬৩২টি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে বনবিভাগ। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় চাউতলী বিটের এসব গাছ কাটার জন্য লাল দাগের চিহ্নিত করা হয়েছিলো।
খাদ্য সংকটে লাউয়াছড়া বন জঙ্গল থেকে বন্যপ্রাণীরা যখন প্রায়ই লোকালয়ে বের হয়ে আসছে, তখন তাদের জন্য ফলের নতুন গাছ না লাগিয়ে উল্টো ৫০ থেকে শতবর্ষী গাছের সঙ্গে আমলকি, জারুল, বহেরা, ডুমুরসহ অর্ধশতাধিক ফলের গাছ কাটার বনবিভাগের আয়োজন চলছিল ।
ফলে বনে থাকা উল্লুক, চশমাপড়া হনুমানসহ বিরল প্রজাতির পৃথিবীজুড়ে মহাবিপন্ন প্রাণীদের খাদ্য ও বাসস্থান আরও হুমকির সম্মূখীন হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বিটের ফলের বাগানের আয়তন ৩২ হেক্টর। এখানে ৯০ শতাংশ প্রাকৃতিক ফলের গাছে পরিপূর্ণ। যে গাছগুলোর বয়স প্রায় ৫০ থেকে একশ বছর এবং এ গাছগুলোই বন্য প্রাণীদের দৈনিক খাবারের জোগান দিয়ে থাকে। এখানে রয়েছে চাপালিশ, বহেরা, ডুমুর, হরিতকি, আমলকি, জারুল, রিঠা, ডেউয়া, লটকন, কাঠ বাদাম, লুকলুকি, কাউফল, বন উরি, কাটা জামসহ অর্ধশতাধিক ফল গাছ। যা থেকে ফল আহরণ করেই বেঁচে আছে বণ্যপ্রাণীরা। ৬০৯১ নম্বরের মূল্যবান কাঠ বাদাম গাছ। লাউয়াছড়ার পার্শ্ববর্তী চাউতলী বিটের পাহাড়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ফলের গাছেই গায়েই লাল রঙের নম্বর লেখা রয়েছে। ৬০৯১ নম্বর গাছটি বিপন্ন প্রজাতি কাট বাদাম বা বাদাম ফল। ১০৬৮ নম্বর লেখা রয়েছে ডুমুর। পাহাড়ের উপর বিশালাকৃতির এ গাছটির গায়ে ডুমুর ফল ধরে রয়েছে।
৩২ হেক্টরের এ ফলের বাগানে মাত্র ১০ শতাংশে রয়েছে উপকারভোগীদের লাগানো একাশিয়া এবং বেলজিয়া গাছ। কিছুদিন আগে সেই একাশিয়া (আকাশমনি) এবং বেলজিয়াম গাছগুলো পাশাপাশি প্রায় সব ফলের গাছ ‘লাল নম্বরযুক্ত’ করে কেটে ফেলার পাঁয়তারা করছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই বিটের রয়েছে অতিমূল্যবান সাতটি বড় বড় আকারের লোহা কাঠের গাছ। শতবর্ষী চাপালিশ গাছও রয়েছে কয়েকটি। যেগুলো বের (পাশ) প্রায় ত্রিশ ফুট। এছাড়া রয়েছে অতি বিরল প্রজাতির বড় আকারের ধূপ বা ধুনা গাছ। সামাজিক বনায়ন বা উপকারভোগীদের গাছ দেখিয়ে অতি মূল্যবান লোহাকাঠ, শতবর্ষী চাপালিশ, ধূপ গাছগুলো কেটে বিক্রি করাই তাদের টার্গেট।
লাউয়াছড়ার পার্শ্ববর্তী বিট চাউতলীর ৩২ হেক্টর বনে ১০ বছর আগে এর ১০ ভাগ জমিতে সামাজিক বনায়ন করে বন বিভাগ। লাগানো হয় আকাশমণি ও বেলজিয়াম গাছ। এখন সময় হয়েছে সেই গাছ কেটে উপকারভোগীদের টাকা ফিরিয়ে দেয়ার। সে জন্য ১০ বছর আগে লাগানো সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সামাজিক বনায়নের গাছের পাশাপাশি বনের বনের দুর্লভ এবং বন্যপ্রাণীদের খাবারের প্রয়োজনীয় গাছও কাটার জন্য বাছাই করেছে মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। যদিও এসব গাছ ৫০ থেকে একশ বছর আগের।ও এগুলো বনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্যপ্রাণীরা এ গাছগুলো থেকে খাবার সংগ্রহ করে।
চাউতলি বিট ঘুরে দেখা যায়, সেখানে ফলের গাছসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির গাছ কাটার জন্য বিশেষ চিহ্ন (লাল নম্বরযুক্ত) দিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহেরা, ডুমুর, হরিতকি, আমলকি, জারুল, রিঠা, ডেউয়া, লটকন, কাঠ বাদাম, লুকলুকি, বন উরি, কাউফল, কাটা জামসহ অর্ধশতাধিক ফল গাছ। এসব অনেক গাছেরই বয়স ৫০ থেকে ১০০ বছর। যার ফল খেয়ে বেঁচে আছে বন্যপ্রাণীরা।
এছাড়াও কাটার জন্য বাচাই করা হয়েছে অতি মূল্যবান ধূপ, শতবর্ষী চাপালিশ এবং সাতটি বড় বড় লোহা কাঠের গাছ। এসব গাছ অতি মূলব্যান বলে জানা গেছে।
উল্লুক, চশমাপরা হনুমানসহ যে সব প্রাণী ফুল ফল খেয়ে বেঁচে থাকে তাদের খাবারের গাছ এমনিতেই কমে গেছে লাউয়াছড়ায়। ফলে প্রায়ই লোকালয়ে ছুটে আসছে বন্যপ্রাণীরা। তার ওপর এভাবে গাছ কাটা হলে বন্যপ্রাণীর খাবারের অভাব আরও তীব্র হবে বলে মনে করেন প্রাণ প্রকৃতি বিশেষজ্ঞরা। লাউয়াছড়ার পার্শ্ববর্তী বিট চাউতলী।
কেন এসব গাছ কাটার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী প্রকৃতি ও সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন জানান, ১০ বছরের রোটেশনে এখন গাছের আবর্তন কাল। তাই গাছ কেটে উপকারভোগীদের টাকা দেয়া হবে। উপকারভোগীরা এতোদিনবাগান রক্ষা করেছে তাদেরকে এখন পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে, এ কর্মকর্তা জানান, ১০ বছর আগে যখন সামাজিক বনায়ন করার আগে থেকেই সেখানে অনেক গাছ ছিল।
তাহলে ১০ বছর আগের সামাজিক বনায়নের গাছের সঙ্গে কেন আগের গাছও কাটা হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, বনের উপকারভোগীরা চায় এসব গাছও কাটতে। তবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নেবেন।
এদিকে লাউয়াছড়ার মত সংরক্ষিত একটি বনে ৫০ থেকে একশ বছরের গাছ কাটার পরিকল্পনাকে অপরাধ বলে মন্তব্য করেন পরিবেশবাদীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১০ বছর আগে সামাজিক বনায়নের সময় ঠিক মতো টাকা খরচ করেননি তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এখন উপকার ভোগীদের বনায়নের টাকা ফেরত দেয়ার সময় এসেছে। তাই তাদের গাছের সঙ্গে বনের পুরানো গাছও কাটার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে ঝুঁকির মূখে পড়তে চলছিল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল্যবান প্রাণীজগৎ।
বন্যপ্রাণী গবেষকরা জানান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান জীববৈচিত্র্য পূর্ণ সংরক্ষিত বন। এখানে উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, উড়ন্ত কাঠবিড়ালিসহ পৃথিবীজুড়ে মহাবিপন্ন নানা প্রাণী রয়েছে। এসব প্রাণী খাদ্যের জন্য সম্পূর্ণ ফল গাছের ওপর নির্ভরশীল। তাই ফল গাছ কেটে ফেললে হুমকিতে পড়বে তাদের অস্তিত্ব।
তারা জানান, এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনার ফল গাছের সংখ্যা কমেছে লাউয়াছড়ায়। ফলে প্রায়ই বন্যপ্রাণীরা সেখান থেকে বের হয়ে লোকালয়ে চলে আসে। এ কারণে এ বনে আরও বেশি করে ফলজ গাছ লাগানো দরকার।
এ বিষয়ে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ) ড. বিশ্বাস করবী ফারহানা জানান, এসব গাছ কাটা হলে বন্যপ্রাণীরা খাবার এবং বাসস্থানের সংকটে পড়েবে। ছুটে যাবে অন্যত্র। ফলে কিছু প্রাণী মারাও যাওয়ারও আশঙ্কা আছে।
তিনি জানান, ব্যক্তিগত লাভের জন্য এত পুরাতন গাছ কেটে নেয়ার ফলে হুমকিতে পড়বে ন্যাচারাল ইকো সিস্টেম। তাই যে কোনোভাবেই হোক এসব গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। যে সব ফলের গাছ কাটার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে তার সবই বন্যপ্রাণীদের খাবারের জন্য দরকারি। খাবারের অভাব থাকলে বন্যপ্রাণীরা বন থেকে বের হয়ে লোকালয়ে চলে আসতে পারে।
বন প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের প্রধান মো. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, বিষয়টি জানার পরে তারা সংশ্লিষ্টদের গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।”
এর আগে আ লিক বন বিভাগ জানিয়েছিল, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির কারণেই এসব গাছ কাটার পরিকল্পনা করা হয়।
কিন্তু, এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদের ফলে তারা বলতে শুরু করেন, গণনার জন্য এসব গাছ চিহ্নিত করা হয়েছিলো। বনবিভাগের মাধ্যমে সারাদেশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিটি পরিচালিত হয়।
এই কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অ লে দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগানো হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরে তা কেটে ফেলা হয়। আর এ থেকে উপার্জিত অর্থ সরকার ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী সংরক্ষক আনিসুর রহমান সম্প্রতি এই এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন এবং বনবিভাগের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন,গত ৩০ ডিসেম্বর আ লিক বনবিভাগ গাছ কাটার সিদ্ধান্ত বাতিলের কথা জানিয়ে ছিলো। তিনি বলেন, “গাছগুলো কাটার আগে যারা এগুলো লাগিয়েছিলো তাদের সঙ্গে একটি বৈঠক হবে এবং কোনো ফলের গাছ কাটা হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “সামাজিক বনায়নের জন্য চাউতলী বিট যেন ভবিষ্যতে আর না ব্যবহার করা হয় সেই সিদ্ধাতও নেওয়া হবে ওই বৈঠকে।”
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস