দিনাজপুরে কবর থেকে মানবদেহের কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। এক মাসের ব্যবধানে প্রায় অর্ধশতাধিত মানবদেহের কঙ্কাল চুরি হওয়াতে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে দুটি কবর স্থানের আশপাশের এলাকার মানুষ। কঙ্কাল চুরির ঘটনা জানাজানি হলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ প্রশাসন। এই ঘটনায় জড়িতদের ধরতেও তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর কোতয়ালি থানার পুলিশ।
দিনাজপুরের সদর উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের উত্তর শিবপুর সরকারি কবরস্থান থেকে গত কয়েকদিনে প্রায় ২২টির বেশি কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। কবরস্থানটি ১৩ দশমিক ৫ একর এলাকা জুড়ে অবস্থিত হওয়ায় চুরি যাওয়া এসব কঙ্কালের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
একই ইউনিয়নের সদরপুর ডাঙ্গাপাড়া তুলা উন্নয়ন বোর্ড কবরস্থান থেকে গত কয়েকদিনে ২০টির বেশি কঙ্কাল চুরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে এসব কবরস্থানে দেখা যায় কঙ্কাল চুরির ঘটনা।
মূলত কবরস্থান গুলোতে কোন সীমানা প্রাচীর, নৈশ্যপ্রহরী না থাকার কারেেণই এমন ঘটনা ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা। সুন্দরবন ইউনিয়নের উত্তর শিবপুর সরকারি কবরস্থান থেকে গত ৬ মাস আগে দাফন করা হয় পার্শ্ববর্তী দরবারপুর গ্রামের মৃত সোহরাব আলীকে। কিন্তু গত বুধবার কবরস্থানে তার পরিবারের লোকজন গিয়ে দেখে কবর খোড়া। কবরে নেই কোন মৃতদেহের অংশ বিশেষ।
মৃত সোহরাব আলীর ছেলে ফেরাজ আলী বলেন, ‘গত বুধবার কবরস্থানের পাশ দিয়ে হেটে যেতেই তার বাবার কবরের দিকে তাকাতেই এমন অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যান তিনি। শুধু সোহরাব আলীর কবরের এই অবস্থা নয়, একই গ্রামের নাজমুল ইসলাম মারা যান গত ৪ মাস আগে। তার কবরে গিয়ে দেখা যায় একই অবস্থা। কবর আছে, কিন্তু মরদেহের কোন চিহ্ন বা কঙ্কালটি নেই। ’
সদরপুর ডাঙ্গাপাড়া তুলা উন্নয়ন বোর্ড কবরস্থান এলাকার মো. সোলায়মান হোসেন বলেন, ‘বুধবার সকাল ৮টার দিকে কবরস্থানের পাশ দিয়ে হাটতে গিয়ে দেখি কবর খোঁড়া। একটু এগিয়ে গিয়ে আমার স্ত্রীর কবরে গিয়ে দেখতে পাই কবর থেকে মৃতদেহটি নেই। কবরের একটি অংশ ফাঁকা পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্ত্রী মৃত মোছা. খাইরুননেছা গত ২ বছর আগে মারা গিয়েছে। তার কবরে থাকা লাশের দেহটি নেই। শুধু আমার স্ত্রীর নয় বরং এই কবরস্থান থেকে আরো ২০ জনের মত কবরে মৃতদেহ গুলো তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা এসব দেখে আতঙ্কে আছি।’
তবে গত এক মাস বা দুই মাস আগে যাদের মৃত্যু হয়েছে এমন কবরের কঙ্কাল চুরি হতে দেখা যায়নি। যে কবর গুলো একটু পুরাতন হয়েছে সেই কবর গুলো থেকে লাশের কঙ্কাল চুরি হতে দেখা গেছে।
কবর থেকে কঙ্কাল চুরির বিষয়ে শিবপুর দরবারপাড়া ফুরকানিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মো. জারিফুল ইসলাম বলেন, ‘করব থেকে মৃতদেহের কঙ্কাল চুরির বিষয়টি ন্যাক্কার জনক। যারা এই কাজটি করেছে তারা ইসলামের শক্র। এদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে।’
সুন্দরবন ইউয়িন পরিষদের চেয়ারম্যান অশোক কুমার রায় বলেন, ‘কঙ্কাল চুরির বিষয়টি আমি জেনেছি। বিষয়টি শুনে আমি নিজেও অবাক হয়েছি। আমি প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি। কঙ্কাল চোরদের দ্রুত সন্ধান করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এ বিষয়ে দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সুজন সরকার বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ কবরস্থান পরিদর্শন করেছে এবং কবর থেকে কঙ্কাল চুরির সত্যতা মিলেছে। কঙ্কাল চুরির চক্রকে সনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং স্থানীয়ভাবে এর সাথে কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই কঙ্কাল চুরি চক্রকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।’
দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহ মো. ইসমাইল হোসেন কঙ্কাল চুরির বিষয়ে বলেন, ‘মানবদেহের কঙ্কাল সাধারণত মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তিনি যখন মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করেন তখন সাইন্টিফ দোকান থেকে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় একটি কঙ্কাল ক্রয় করেন।
কঙ্কাল চুরির বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, এখন একটি কঙ্কালের দাম বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটি চক্র এসব কঙ্কাল চুরি করে সাইন্টিফিক দোকানে বিক্রি করতে পারে। দিনাজপুরে এমন সাইন্টিফিক কোন দোকান নেই। তাই চুরিকৃত এসব কঙ্কাল জেলার অন্যান্য স্থানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করার ধারণা করেন তিনি।’
বার্তা বাজার/এম.সি