দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চরম বিশৃঙ্খলা ও কেলেঙ্কারিতে আলোচনায় তুঙ্গে ছিল। লাগামহীন দুর্নীতি হচ্ছে প্রকল্পে। কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল না উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে। বাজারশূন্যের সাথে সামঞ্জস্যহীন, অতিরঞ্জিত ও অস্বাভাবিক পণ্যমূল্য ধরা হয়। ব্যয়ের হিসাব মেলাতে চাতুরতার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। তাও হিসাব মিলছে না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বালিশ কেলেঙ্কারি; পুকুর খোঁড়ার প্রশিক্ষণ নিতে পাল ধরে বিদেশ গমন; বিবিএসে চাকরি এক, বেতন দুই; চট্টগ্রাম মেডিক্যালে প্রতিটি পিলোকভার ২৮ হাজার টাকা; পিলো ২৭ হাজার ৭২০ টাকা; ডিসপোজাল মাস্ক ও ক্যাপ ৮৪ হাজার টাকা; রেলের ক্লিনারের বেতন ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা; স্যালাইন স্ট্যান্ড ৬০ হাজার টাকাসহ প্রকল্পের বিভিন্ন জিনিসের আকাশচুম্বী ও চোখ ধাঁধানো দাম আলোচনায় ছিল বছরের শেষ ছয় মাসে, যা সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে বালিশ, আসবাবপত্রসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক পণ্য কেনায় দুর্নীতির ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যহীনভাবে পণ্যের মূল্য ধরা হয়। পণ্য অস্বাভাবিক দামে কেনা ও সেগুলো ফ্ল্যাটে তোলার ব্যয় নিয়ে বেশ বিতর্ক চলে। ওই ভবনের ফ্ল্যাটের জন্য এক হাজার ৩২০টি বালিশ কেনা হয়েছে। এসব বালিশের প্রতিটির মূল্য দেখানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর সেই বালিশ নিচ থেকে ভবনের ওপরে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। শুধু বালিশের বিষয়েই নয়, প্রকল্পের আসবাবপত্র কেনার নথিপত্র পর্যালোচনা করে আসবাবপত্র কেনা ও ফ্ল্যাটে তোলার ব্যয়ে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পের বালিশ কাণ্ড নিয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। পরে দুর্নীতির তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন। সেই তদন্ত এখনো চলছে। ১৬ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রত্যাহার করা হয়। ঢাকায় বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভের মুখে এসব পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়।
অব্যবহৃত শত কোটি টাকা খরচের জন্য এখন মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। চলমান ৭২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে সম্মানী খাতে ৩২৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা ও কমিটির মিটিং ও কমিশন ফি ১১ কোটি টাকা। আর পরামর্শক খাতে ১৮০ কোটি টাকা। টিএ/ডিএ ২৬ কোটি টাকা, আর ট্রাভেল খরচ ১৪ কোটি টাকা। এই ব্যয়গুলো চলমান আছে ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেইজড (এনএইচডি) বা জাতীয় খানাগুলোর ডাটাবেইজ প্রকল্পে। সাড়ে চার বছরের এই প্রকল্পের ছয় বছরে অগ্রগতি মাত্র ৮৫ শতাংশ।
অন্য দিকে, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পে ২০ থেকে ৫০ টাকা দামের একটি স্টেরাইল হ্যান্ড গ্লোভসের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। দুই হাজার টাকা দামের পিলোর দর ২৭ হাজার ৭২০ টাকা আর তার কভার ২৮ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ওই কভারের দাম ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এ ছাড়া ডিসপোজেবল সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্কের প্রতিটি মূল্য ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। যার বাজার দর সরেজমিনে যাচাই করে জানা গেছে, মানভেদে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের প্রস্তাবিত খরচ বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০ বেডেড ও জেলা সদর হাসপাতালে ১০ বেডেড কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন প্রকল্পে স্যালাইন ঝুলানোর জন্য স্যালাইন স্ট্যান্ডের দাম ধরা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। আর চেহারা দেখার জন্য লুকিং গ্লাসের দাম ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এসবের ব্যাপারে জানান, এ ধরনের কেনা নিয়ে আমরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বলা হয়েছে এখন থেকে প্রকল্পের কেনাকাটার ব্যয়গুলো যাচাই করার জন্য। বাজারদরের সাথে মিলিয়ে এসব ব্যয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারপর অনুমোদন দিতে হবে।