রাত পোহালেই আসছে নতুন বছর ২০২০ইং সালের ইংরেজী নববর্ষের পহেলা জানুয়ারী। টানানো ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ২০১৯ইং সাল নামক আরো একটি বছর বিদায় নিচ্ছে। বছর ঘুরে বছর আসে এটাই নিয়ম। কিন্তু এ নিয়মের মধ্যে বছরজুড়ে আলোচনা আর মানুষের মনে দাগ কাটে এমন ঘটনায়ই ছিল হবিগঞ্জ-৪ আসনের চুনারুঘাট উপজেলায় ভরপুর।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চুনারুঘাট-মাধবপুরবাসী নতুন প্রতিমন্ত্রী পাওয়া, উপজেলা নির্বাচন, বছর জুড়ে অবৈধ বালু উত্তোলন আর বছর শেষে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরোদ্ধে প্রশাসনের সাড়াশি অভিযান ছিল আলোচনায়। বছরের মাঝামাঝি ৩ শতক জমির জন্য র্যাব সদস্যের পরিকল্পনায় দিন মজুর দুলা মিয়া হত্যা ছিল বেশ সমালোচিত। এর মধ্যে উপজেলা নির্বাচনে নৌকা আর আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আনারসের নির্বাচন নিয়ে এখনো আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এনিয়ে বিভক্ত উপজেলা আওয়ামীলীগ।
এছাড়া বিভিন্ন অবৈধ দখলদার ও বালু মহালে বছর শেষে সহকারি কমিশনারের সাড়াশি অভিযান ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এর বাইরে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া সীমান্তের চোরাচালানও ছিল বেশ আলোচনায়। বিশেষ করে চা পাতা চোরাচালানের কারণে এ এলাকার চা শিল্প পড়েছে চরম সংকটে। শত কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে এ শিল্প।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর ২০১৯ইং সালের প্রথমে চুনারুঘাটবাসী বড় উপহার হিসেবে পান স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট মাহবুব আলীকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে। এ নিয়ে চুনারুঘাট মাধবপুরবাসীর আনন্দের শেষ ছিলনা। পর্যটনে সম্ভাবনাময় চুনারুঘাটের উন্নয়ন নিয়ে চুনারুঘাটবাসী আশায় বুক বাধে। মার্চ মাসের উপজেলা নির্বাচন ছিল বছরজুড়ে আলোচনায়। এ নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ আবু তাহের ত্যাগী আওয়ামীলীগ নেতা এবং তৃণমুলের প্রার্থী হওয়ার পরও দলীয় মনোনয়ন পাননি। এনিয়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের শেষ ছিলনা। যা পরবর্তীতে রূপ নেয় বিদ্রোহী হিসেবে আবু তাহের এর নির্বাচনে অংশ গ্রহন। আওয়ামীলীগের প্রায় সবায়ই পক্ষ নেন আবু তাহের এর আনারসের।
এ নির্বাচনে আবু তাহের স্বতন্ত্র হিসেবে আনারস মার্কা নিয়ে নির্বাচন করে নৌকার কাছে মাত্র সাড়ে ১৩‘শ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। এনিয়েও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে নানা ক্ষোভ। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে পুরো আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ নেয়। যা পরবর্তীতে আওয়ামীলীগের বিভক্তি প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এখনও চুনারুঘাটে আনারসের নির্বাচনকারীরা বিরোধীদল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বছর জুড়েই এ আলোচনা আর ক্ষোভ নেতাকর্মীদের মনে। যারা নৌকার নির্বাচন করেছে তারা আওয়ামীলীগ আর যারা আনারসের নির্বাচন করেছে তারা এখন বিরোধীদলের কাতারে। উপজেলা প্রশাসনসহ সারা উপজেলায় এখন এমন প্রচারনাই বেশি। চলছে নাম কাটা আর বসানোর পালা। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপজেলায় এমনই বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
বছরের মাঝামাঝি সময়ে ১৭ জুন উপজেলার পাট্টাশরীফ গ্রামে ৩ শতক বসতভিটা নিয়ে র্যাব সদস্য ছাদেক মিয়ার পরিকল্পনায় তার চাচা দুলা মিয়াকে অপহরণ করে ঢাকায় নিয়ে হত্যা করে লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়া ও পরবর্তীতে একটি চিরকুটের সুত্র ধরে হত্যার রহস্য উদঘাটনের ঘটনা ছিল বছরের আলোচিত সমালোচিত ঘটনা। পরবর্তীতে র্যাব সদস্য ছাদেক মিয়াসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
বছরের আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে উপজেলার বিভিন্ন নদী নালা, খাল বিল, ছড়া আর চা বাগান ও পাহাড়ী এলাকা থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়। বছরের প্রতিমাসের আইনশৃঙ্খলা সভায় এসব বিষয় ছিল সরগরম। এছাড়া বালু পরিবহনের কারণে পুরো উপজেলার রাস্তাঘাট ভেঙ্গে চুরমার ও মানুষ চলাচলের অনুপযোগী বিষয়টিও ছিল আলোচনায়। কিন্তু বছর শেষে সেপ্টেম্বর মাস থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং অবৈধ করাতকল ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ছিল বেশ আলোচিত।
নতুন সহকারি কমিশনার নুসরাত ফাতিমা চুনারুঘাটে যোগদান করার পরই নামেন অভিযানে। তিনি বালু খেকোদের বিরোদ্ধে অভিযানে নেমে রীতিমত হিরো বনে যান। গত ৩ মাসে তিনি উপজেলার বিভিন্ন বালু মহাল ও নদীতে অভিযান করে কমপক্ষে অর্ধশত ড্রেজার মেশিন, এক্সেভেটর এবং কয়েক হাজার মিটার পাইপ জব্দ ও পুড়িয়ে নষ্ট করেন। একই সাথে বেশ কয়েকজনকে জেল জরিমানা করেন। এসময়ে তিনি প্রায় ৩০ লাখ টাকারও বেশি টাকা জরিমানা আদায় করেন। যা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। এছাড়া তিনি অসংখ্য ট্রাক্টর ও ট্রাক আটক করে জরিমানা করেন। যা ছিল আলোচনায়। তার ভয়ে তঠস্থ ছিল পুরো উপজেলা। সবকিছুই যেন নিয়মের মধ্যে চলে এসেছিল। তিনি যখন অফিস থেকে বের হতেন তখন চারদিকে খবর পড়ে যেত নুসরাত ফাতিমা আসছেন। তখন যানজট থাকতো না। প্রায় সকল স্থানে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সকল অনিয়মই নিয়মে পরিনত হতো। তবে অনেকেই তার এসব কর্মকান্ডকে বেশি বাড়াবাড়ি বলেও মন্তব্য করেন। সর্বোপরি তিনি গত ৩ মাস তিনি ছিলেন চুনারুঘাটের হিরো। গত সপ্তাহে তিনি স্কলারশীপ নিয়ে আমেরিকা যাওয়ার কারণে চুনারুঘাট থেকে বিদায় নেন। তিনি বলেছিলেন চুনারুঘাটবাসী তাকে মনে রাখবে। এখন ঠিকই চুনারুঘাটবাসী তাকে মনে রাখছেন বলে আলোচনা চলছে।
এর বাইরে চুনারুঘাটে বছর জুড়েই আলোচনায় ছিল সীমান্তে চোরাচালান। নানা প্রকার মাদক পাচার হয়ে আসার পাশাপাশি গরু, চা পাতা ও সেপ্টম্বর মাসের শেষ দিকে খোয়াই নদী দিয়ে চোরাই পথে ভারত থেকে নিয়ে আসা ভাসমান প্রায় ২৪ লক্ষ টাকার ভারতীয় নিম্নমানের চা পাতা ও টায়ার পাচার হয়ে আসার ঘটনা বেশ তোলপাড় করেছে এবং বেশ কিছু চা-পাতা ও টায়ার জনসাধারণ কুড়িয়ে নিয়ে যায় এ নিয়ে ছিল উপজেলায় বেশ আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে চা পাতা আসার কারণে উপজেলার ছোট বড় ২৪টি চা বাগান মারাত্বক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। ভারতীয় চা পাতা অবাধে দেশে প্রবেশ করার কারণে এসব চা বাগানে এখনও উৎপাদনের ৪০ শতাংশ চা পাতা গুদামে ও ওয়ারহাউজে পড়ে আছে। প্রতি কেজি চায়ে দাম কমেছে ১শ থেকে দেড়শ টাকা। এতে করে এসব চা বাগান শত কোটি টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। অধিকাংশ বাগান তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেনা। ফলে অস্তিস্ত সংকটে পড়েছে এসব চা বাগান।
এছাড়া বছরের শেষে এসে আলোচনায় ছিল দেশ থেকে চীন থেকে আমদানী করা রসুন পাচার হয়ে যাওয়ার বিষয়। মটরসুটি, ডাল, সুটটি মাছ পাচারের বিষয়টিও ছিল আলোচিত ও সমালোচিত। অবশ্য এসব প্রতিরোধে বিজিবি এবং প্রশাসন তৎপর হয়ে উঠে এবং বিশেষ আলোচনা ও সমাবেশ করে। এছাড়া জুুলাই আগষ্ট মাসে চা শিল্প এলাকায় ঘন ঘন ডাকাতির ঘটনায় আতংক ছড়িয়ে পড়া এবং পরবর্তেিত বন্দুকযুদ্ধে এক ডাকাত নিহতের ঘটনাও ছিল আলোচিত। এর বাইরে বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৯টি হত্যাকান্ড ও ৬টি লাশ উদ্ধারের ঘটনাও ছিল আলোচিত।