ফিরে দেখা সাতক্ষীরা-২০১৯ ৩৫ খুন ও ৯ টি বন্দুকযুদ্ধ

বছরের মধ্যভাগে আওয়ামী লীগ নেতা নজরল হত্যা ও শেষভাগে বিকাশ এজেন্টের ২৬ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত জেলা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাদিকুর রহমান কয়েক সহযোগীসহ গ্রেফতার ও পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে তার দুই দেহরক্ষীর নিহত হবার ঘটনা এবার সাতক্ষীরায় সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল। জেলাব্যাপী এ বছর ৩৫ টি খুন ও ৯ টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও ছিল বহুল আলোচিত।

৬ জানুয়ারি আশাশুনির কুল্ল্যা ইউপির গাবতলায় প্রশান্ত দাসের মেয়ে গাবতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সুষ্মিতা দাসকে ধর্ষনের পর হত্যা করে লাশ সেফটি ট্যাঙ্কিতে ফেলে গুম করার চেষ্টা করে একই গ্রামের নির্মল সরকারের ছেলে বুধহাটা কলেজিয়েট স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রও জয়প্রকাশ সরকার ওরফে জয়দেব। তালার গাছা গ্রামে নবপরিণীতা বধূ শিল্পী সরকারের ঝুলন্ত লাশ ১১ জানুয়ারি তার শ্বশুর বাাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়।

২৩ জানুয়ারি দেবহাটার সখিপুরের চিনেরডাঙ্গা বিলের আশরাফুলৈর মাছের ঘেরে আহম্মদ আলীর ছেলে নির্মাণ শ্রমিক আলি হোসেনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি আশাশুনির আনুলিয়া ইউনিয়নর রাজাপুর গ্রামের খোকন গাজীর ছেলে মোটর সাইকেল চালক জাহাঙ্গির হোসেনকে ভাড়ায় ডেকে নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর একসরা দাখিল মাদ্রাসার সেফটি ট্যাঙ্কিতে ফেলে লাশ গুম করার চেষ্টা করা হয়। ৪ মার্চ তালার রঘুনাথপুর ৬৫ বছরের বৃদ্ধ শামসুর রহমানকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরকীয়ার কারণে ৫মার্চ সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর ইউনিয়নর ওমরাপাড়া গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র হাবিবুর রহমান সবুজকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে খুলনার ফারাজিপাড়া মোড় এলাকায় নিয়ে খন্ড খন্ড করে হত্যা করা হয়।

আশাশুনির প্রতাপনগর ইউপির তালতলায় বড় ভাই আমিনুর রহমানের ছুরিকাঘাতে ছোট ভাই আনোয়ারুল সরদার ১১ মার্চ খুন হন। ২৭ মার্চ আশাশুনির বড়দল ইউপি ছাত্রলীগ সভাপতি নাহিদ হোসেন বাবু ও তার সহযোগী কাজল সানা, আইউব আলি ও টুটুল হাতুড়ি পেটা করে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক সানার ছেলে তৌহিদ সানাকে। ১৪ এপ্রিল তালার কপোতাক্ষের বাহাদুরপুর অজ্ঞাত ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে অন্য জায়গায় হত্যা করে লাশ কপোতাক্ষ ফেলা হয় বল প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানতে পারে। কলারোয়ার গদখালিতে গৃহবধূ প্রাপ্তির রহস্যজনক ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, আশাশুনির কাদন্ডায় কাসেম মালি তার স্ত্রী শাহিদা খাতুনকে শ্বাসরোধে হত্যার পর স্বামী আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা, কলারোয়ার বুইতা গ্রামের গৃহবধূ মুসলিমা খাতুনকে পিটিয়ে হত্যা, ১৩ এপ্রিল কলারোয়া উপজেলার খোরদা গ্রামের গাছের ডাল কাটতে বাধা দেওয়ায় ভাইপোর হাতে খুন হন বজলুর রহমান।

২৯ এপ্রিল শ্যামনগরের পশ্চিম পরানপুরের চাচা ফজলুল হককে সালিশ বৈঠকের মধ্যে ভাতিজা জুবায়ের কর্তৃক মাথায় লাঠির আঘাতে হত্যার ঘটনা ছিল আলোচিত। পহেলা মে আশাশুনির বালিয়াপুর খোলচক ঘের দখলকে কেন্দ্র করে লতাখালির অব্দুল জলিলের ঘের চম্পাফুল গ্রামের সাজউদ্দিন গাইনের ছেলে মোনায়েম গাইন খুন হন। ১০ মে শুক্রবার সদরের কুশখালি সীমান্তে ভারতের দুবলি বিএসএফএর নির্যাতনে আজিজ সরদারের ছেলে আহত গরু রাখাল কবিরুল ইসলামের মৃত্যু হয় সাতক্ষীরা হাসপাতালে। ১৭ মে তালার খলিষখালি ইউনিয়নর চাদকাটি গ্রামের সুরমাতুল্ল্যাহ মোড়লের ছেলে নজীর আলী গাজী মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রী ফিরোজা বেগমের হাতে খুন হন। ১৯ মে কালিগঞ্জের শুইলপুর ইছামতি নদী থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার এবং ২৬ মে কালিগঞ্জের বিষ্ণুপুর ইউপির বন্দেকাটি গ্রামে ছাগল লাউগাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে বড়ভাই আজগরের দায়ের কোপে ছোট ভাই আক্কাজ খুন হন।

৩ জুন কলারোয়ার রামভদ্রপুর মাছের ঘেরের বেড়ি বাঁধের ওপর মাজেদুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৮জুন আশাশুনির সাদকোনায় গৃহবধূ নুরুন্নাহারকে হত্যা করে লাশ ঘরের আড়ায় ঝুলিয়ে রাখা হয়। ২০ জুন তালার ইসলামকাটি গ্রামের মনোরঞ্জন দাসের স্ত্রী পুস্প রাণী দাসকে ধর্ষণের পর হত্যা করে পাটক্ষেতে ফেলে রাখা হয়। এক সপ্তাহ পর ২৭ জুন গলিত লাশ উদ্ধার হয়। ১৩ জুলাই সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গায় ছাগল পাটের কচি চারা খাওয়াকে কেন্দ্র করে আকবর আলি সরদারসহ তিন ভাইকে মসজিদের মধ্যে কুপিয়ে জখম করা হয়। ১৭ জুলাই খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আকবর আলী।

২২ জুলাই সকাল ১১ টায় শহরতলির কদমতলা হাজামপাড়ায় আগরদাঁড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সহসভাপতি নজরল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। (এই নিয়ে একই পরিবারের ৫ জন খুন) ঘটনা জেলায় তোলপাড় শুরু হয়। ২৫ জুলাই তালার মুড়াগাছায় জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে খালেক সরদার খুন হন। ২৯ জুলাই ঝাউডাঙ্গার গোবিন্দকাটি গ্রামের ফকির আহম্মদ সরদারের ছেলে সংগ্রাম পরিবহনের সুপারভাইজার আলমগীর হোসেন আলম প্রথম স্ত্রীর প্রমিকের হাতে খুন হন।

৩০ জুলাই কলারোয়ার সোনাবাড়িয়ায় নিজ বাড়ির উঠানে চেয়ার বসে থাকাকালে প্রতিবেশিদের এলোপাতাড়ি দায়ের কোপে ট্রলি চালক আফজাল হোসেনকে হত্যা করা হয়।

৭ আগস্ট তালার তৈলকুপি গ্রামে দু’ বোন ও ছৌট ভাই ওয়াসিমের লাঠির আঘাতে খুন হয় বড় ভাই ইসহাক মোড়ল। ২৪ আগষ্ট শ্যামনগরের গাবুরার পারসেমারি ঘেরে লাঠির আঘাতে খুন হন আমিরুল সরদার (এ নিয়ে এই ঘেরে খুন সাতজন)। ২৭ আগষ্ট সদর উপজেলার তলুইগাছা গ্রামে গৃহবধূ রাবেয়া খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার ও ২৮ আগষ্ট তালার অভয়তলায় জুয়ার আড্ডা থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে পালানোর সময় পড়ে গিয়ে রৈজাউল ইসলামের রহস্যজনক মৃত্যু হয়।

৫ নভেম্বর দিনে শ্যামনগরের ভুরুলিয়ার এক হিন্দু বিধবাকে ধর্ষণের পর হত্যা করৈ লাশ শ্যামনগর সদরের একটি প্রেট্রোল পাম্প সংলগ্ন ধান খেত থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৭ নভেম্বর কালিগঞ্জের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের শহিদুল ইসলাম তার স্ত্রী মারুফা খাতুনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রাখে। ২৮ নভেম্বর লাশ উদ্ধার করা হয়। ৭ ডিসেম্বর শ্যামগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি কাগজীপাড়ায় স্ত্রী সোনাভান বিবিকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ৈ হত্যার পর স্বামী আব্দুল মান্নানের গাছের ডালে গরুর রশির ফাঁস ঝুলিয়ে আত্মহননের ঘটনাই ছিল এ বছরের শেষ নৃশংসতা। এছাড়া বছরব্যাপী আরও কয়েকটি অস্বাভাবিক মত্যুর ঘটনাও ঘটৈ। তবে পুলিশ বলেছে এ সব ঘটনার বেশিরভাগ ছিল পারিবারিক বিরোধ, জমি ও ঘর নিয়ে সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারের জের। তবে অনেক ঘটনা হত্যা না আত্মহত্যা তা ময়না তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া বলা যাবে না।

এ দিকে এ বছর সাতক্ষীরায় পুলিশ ও র‍্যাবর সাথে সস্ত্রাসীদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৯ জন নিহত হয়। এর মধ্যে ছিল ১৫ জানুয়ারি তালার তেঁতুলিয়া ইউপির বিশ্বাসের মোড় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিকড়ি গ্রামের মইজুদ্দিন আহমদ টুলুর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার। পুলিশের দাবি এটি ছিল দু’দল মাদক ব্যবসায়ীর গোলাগুলি।

২৮ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলাগাছিয়া খালে জলদস্যু সাহেব আলি বাহিনী প্রধান সাহেব আলি ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হাবিবুর রহমান র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এ সময় তিনটি বন্দুক ও ৩২ রাউন্ড কাতুর্জ জব্দ করা হয়। পহেলা মে কালিগঞ্জ উপজেলার কাশিবাটি গ্রামের ঠান্ডাই সরদারের ছেলে নোবা সরদারকে একই গ্রামের হাটখোলা মোড়ের আজগার সরদারের পুকুরে কচুরি পানা পরিষ্কার করার সময় কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক তহিদুর রহমানসহ দু’জন মোটর সাইকেল করে তুলে নিয়ে যান। ৫ মে ভাড়াসিমলা ও সুলতানপুরের মাঝখানে সাত্তারের মুদি দোকানের সামনে থেকে জনগন তার গুলিবিদ্ধ লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশের দাবি চিংড়িখালি ঘেরে সংঘর্ষের জেরে দু’দল ভূমিহীনের গোলাগুলিতে নিহত হয় নোবা।

তার বিরুদ্ধে জোড়া খুন ও ডাকাতিসহ ১০ টি মামলা ছিল। ১০ জুন সাতক্ষীরার বাইপাস সড়কধারে কুচপুকুর এলাকার ইটভাটার পাশে মুকুল মোল্লা নামের এক কুখ্যাত চোরের হাত পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় বলে স্বজনরা দাবি করলেও পুলিশ তা অস্বীকার করে জানায় সে ছিল মাদক ব্যবসায়ী ও ১৭ টি চুরি মামলার আসামি। ২৩ আগস্ট সাতক্ষীরা শহরের অদুরে বাঁকাল ইসলামপুর চর শ্যামনগর উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের মুনসুর শেখ নামের এক মাদক ব্যবসায়ির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দু দিন আগে পুলিশ পরিচয় ধরে নিয়ে যাওয়া সদর উপজেলার কুচপুকুর বড়জামতলার মোক্তার সরদারের ছেলে কবীরুল ইসলাম ৫ সেপ্টেম্বর ভোরে বাইপাস সড়কের শুকোর আলীর ভাটার সামনে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান বলে স্বজনদের অভিযোগ।

পুলিশের দাবি সে ছিল আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল হত্যার আসামি। দু’দল সন্ত্রাসীর মধ্যে গোলাগুলিতে নিহত হয় সে। এ সময় একটি বিদেশি পিস্তল জব্দ করা হয়। তার পরিবারের দাবি এর আগে পুলিশ তাকে ও মধুকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে। পরে মধুকে ছেড়ে দিয়ে কবিরকে আটকে রাখে।

এদিকে গত ২৯ নভেম্বর ভোর তিনটার দিকে জেলা ছাত্রলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সাধারন সম্পাদক সৈয়দ সাদিকুর রহমানের দুই দেহরক্ষী মুনজিতপুরের মইনুল ইসলামের ছেলে মামুদুল ইসলাম দ্বীপ ও কালিগঞ্জের চাম্পাফুল ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামের আব্দুস সবুরের ছেলে সাইফুল ইসলাম পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এ সময় দুটি দেশি পিস্তল ও গুলি জব্দ করা হয়। পুলিশ বলেছে কালিগঞ্জ বিকাশ এজেন্টের ২৬ লাখ টাকা ছিনতাই ঘটনার সাথে জড়িত দ্বীপ ও সাইফুলকে রাতে তাদের ডেরায় অন্য সহযোগীদের ধরতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের সাথে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনায় নিহত হয় দ্বীপ ও সাইফুল। স্বজনদের দাবি তাদেরকে তিন দিন আগে শহরের সুলতানপুর থেকে পুলিশ পরিচয়ে আটক করা হয়।

বার্তাবাজার/এইচ.আর

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর