২০১৯: কেড়ে নিয়েছে অনেক শিশুর প্রাণ

হত্যা, বিকলাঙ্গ, অপহরণ, যৌন সহিংসতা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগসহ নানা নির্যাতন-নিপীড়নে গত এক দশক পার করতে হয়েছে অসংখ্য শিশুকে। বিশ্বের লাখ লাখ শিশুর শৈশব, স্বপ্ন আর জীবনের বিনিময়ে নতুন এক দশক শুরু করতে যাচ্ছি আমরা। গত দশক ছিল শিশুদের প্রাণ কেড়ে নেয়ার বিভৎস স্মৃতিতে পূর্ণ।

চলতি দশকের শুরু থেকে দেশে দেশে যুদ্ধ আর সহিংসতার কারণে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি শিশুর বিরুদ্ধে এসব অপরাধ সংগঠিত হয়েছে বলেছে যাচাইকৃত তথ্য আছে জাতিসংঘের কাছে। তার মানে গত দশকে প্রতিদিন গড়ে ৪৫টি বিশ্বের এই যুদ্ধ সহিংসতা আর নির্মমতার শিকার।

সশস্ত্র সংঘাত প্রত্যেকের জন্য বিধ্বংসী কিন্তু বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটা পাশবিক। আফগানিস্তান থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে বিশ্বের নানাপ্রান্তে গত ১২ মাসেও শিশুদের এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সহিংসতার বিধ্বংসী প্রভাবের শিকার হয়েছে লাখ লাখ শিশু।

জানুয়ারি

চলতি বছরের শুরুর মাসে উত্তর ও পূর্ব সিরিয়ার শিশুরা সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতসহ নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। জানুয়ারিতে দেশটিতে কমপক্ষে ৩২ জন শিশুর প্রাণ হারিয়েছে। আট বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ আমাদের সময়ের সবচেয়ে গভীর সংকট, যার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে শিশুদের।

ফেব্রুয়ারি

ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকার দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) উত্তরাঞ্চলে মহামারি ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্রে সহিংস হামলা চালানো হয়। দেশটিতে এমনিতেই এই মহামারি রোগে অসংখ্য শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তার ওপর এমন হামলা রোগটি মোকাবিলার কাজ আরও জটিল হয়ে পড়ে।

ইবোলা মহামারি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি মারাত্মক ব্যাধি কিন্তু শিশুদের জন্য তা আরও ভয়ানক। শুধু শিশুরা এ রোগে আক্রান্তই হয়ে মারাই যায়নি বরং এই মহামারিতে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও তাদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বেঁচে থাকা অবশিষ্ট প্রিয়জনদের হারিয়ে একাকী এক নির্মম জীবন যাপন করে যাচ্ছে।

মার্চ

আফ্রিকার আরেক দেশ সেন্ট্রাল মালিতে ২০১৯ সালে মানবিক সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। মার্চে দেশটির মোপতি অঞ্চলের ওগোসসাগো নাম গ্রামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় দেড় শতাধিকা নিরীহ মানুষ নিহত হয়। নিহত এসব মানুষের মধ্যে অসংখ্য শিশুও ছিল।

এছাড়া অত্যাধুনিক বিষ্ফোরক, ছোট ছোট অস্ত্রের বিস্তার আর ডাকাতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে আশঙ্কাজনক হারে হামলা বৃদ্ধির শিকার হয়েছে দেশটির অসংখ্য শিশু। এসব সহিংসতার কারণে দেশটিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

এপ্রিল

এপ্রিলের শুরুতে ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় শহর সানায় এক বিষ্ফোরণে ১৪ শিশু নিহত ও ১৬ শিশু মারত্মকভাবে আহত হয়। দুপুরের খাবারের আগে শিশুরা যখন ক্লাসে ছিল ঠিক তখনই বিষ্ফোরণটি হয়েছিল দুটি স্কুলের পাশে। বিষ্ফোরণে স্কুল দুটির জানালা ভেঙে যায়, বিষ্ফোরক আর বিচ্ছিন্ন কাচের টুকরোতে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

চলতি দশকে গোটা বিশ্বে শিশুদের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক মানবিক সংকট চলছে ইয়েমেনে। সেখানকার পরিস্থিতি শিশুদের জন্য বিধ্বংসী। বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ-সহিংসতা, অনুনন্নয়, দারিদ্র্য দেশটির লাখ লাখ শিশুকে চরম দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শিক্ষার সুযোগ না পেয়ে এসব শিশুরে উজ্জ্বল ভবিষ্যত অঙ্কুরে বিনষ্ট।

মে

জাতিসংঘের শিশু উন্নয়ন তহবিল ইউনিসেফ সিরিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, তাদের সন্তান যারা তাদের নাগরিক বা তাদের নাগরিক হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছে এবং উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার আশ্রয়কেন্দ্র ও বন্দিশিবিরে এখন আটকা পড়েছে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।

ইরাক, সিরিয়া এবং অন্য দেশের আশ্রয়কেন্দ্র, বন্দিশিবির ও এতিমখানায় থাকা বিদেশি ‘যোদ্ধাদের’ হাজার হাজার শিশু আটকা পড়ে আছে। এই শিশুগুলো বিশ্বের সবচেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে যাচ্ছে। এদিকে মে মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার কারণে অনেক শিশু হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

জুন

জুনে নাইজেরিয়ার বর্নো প্রদেশে ফুটবল খেলা দেখার সময় তিন শিশুর শরীরে বিষ্ফোরক বেঁধে আত্মঘাতী হামলায় তাদের ব্যবহার করে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। হামলায় ৩০ জন নিহত ছাড়া কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়। শিশুদের মানব বোমা হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে নিন্দা জানিয়ে তা বন্ধের আহ্বান জানায় ইউনিসেফ।

২০১২ সাল থেকে নাইজেরিয়ার উত্তরপূর্বের সশস্ত্র গোষ্ঠীরা শিশুদের দলে নিয়োগের মাধ্যমে তাদের মানব বোমা হিসেবে বিভিন্ন হামলায় ব্যবহার করে আসছে। এছাড়া শিশুদের ধর্ষণ, জোরপূর্বক বিয়েসহ নানা মর্মান্তিক নির্যাতন চালায়। তাদের মধ্যে অনেকে আটক অবস্থায় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে কোনো রকমের চিকৎসা ছাড়াই সন্তান জন্ম দেয়।

জুলাই

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে জুলাই মাস শুরু হয় ব্যস্ত সড়কে প্রাণঘাতী এক বিস্ফোরণে অসংখ্য শিশু আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরন করার মধ্য দিয়ে। তারপর ওই মাসের শেষে দক্ষিণ সুদানের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে ৩২ শিশুকে উদ্ধার করা হয়। যদিও দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে এখনো হাজার হাজার শিশু বন্দি রয়েছে।

আগস্ট

আগস্টের মাঝামাঝি উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়। আট বছর ধরে দেশটিতে চলা সশস্ত্র সংঘাতে শিশু অধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। বেসামরিক এলাকায় শিশুরা বিস্ফোরক অস্ত্রের দ্বারা প্রাণ হারিয়েছেন নয়তো পঙ্গু হয়েছেন। হাসপাতালসহ স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে শিশুদের।

সেপ্টেম্বর

সেপ্টেম্বরে নতুন শিক্ষা বছর শুরু হলে ইউনিসেফ হিসাব করে দেখে দেশটির প্রায় ২০ লাখ শিশু স্কুল থেকে ঝড়ে পড়েছে। তার মধ্যে চার ভাগের একভাগ শুধু ঝড়ে পড়েছে ২০১৫ সালের মার্চে দেশটির সংঘাত শুরু হওয়ার পর। এছাড়া দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে অপুষ্টিতে হাজার হাজার শিশু দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছে।

অক্টোবরে

অক্টোবরে শুরুতে সিরিয়ার উত্তর-পূর্বে নতুন করে সহিংসতা-সংঘাত শুরু হলে পাঁচ শিশু নিহত ছাড়ার হাজার হাজার শিশু তাদের পরিবারের সঙ্গে বাস্তচ্যুত হয়। সামরিক হামলার কারণে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পানি সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হল মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পারে না।

বোমা হামলা, যুদ্ধ আর বিস্ফোরণের কারণে যেসব মানুষ বাস্তচ্যুত হয় তাদের অনেকে, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক সহযোগিতা জরিুর হয়ে পড়ে। কিন্তু শিশুদের একেবারে মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না সেখানে। ইউনিসেফের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশটির যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার শিশু নিহত হয়েছে।

নভেম্বর

নভেম্বরে ইউনিসেফ জানায়, ক্যামেরুনে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে তিন বছর ধরে চলা সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে ৮ লাখ ৫৫ হাজারেরও বেশি শিশু স্কুল থেকে ঝড়ে পড়েছে। ২০১৭ সালে চারটি অঞ্চলে সহিংসতা চললেও ২০১৯ সালে তা আটটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম, স্কুল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রতে হামলার কারণে ভয়ে হাজার হাজার শিশু পরিবারের সাথে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ডিসেম্বর

চলতি বছরে উত্তর ইউক্রেনে স্কুলে ৩৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েঠে ৫ লাখের মতো শিশু। এদিকে ডিসেম্বরের শুরুতে আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে প্রার্থনালয়ে বন্দুকধারীর হামলায় পাঁচ শিশু নিহত হয়। সম্প্রতি সিরিয়ায় ব্যাপক হামলায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। প্রতিদিন এ সংখ্যা বাড়ছেই।

ইউনিসেফ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি আফগানিস্তানের জন্য ‘শিশু সতর্কতা’ ঘোষণা করে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালের প্রথম নয় মাসে আফগানিস্তানে প্রতিদেন গড়ে নয়টি শিশু নিহত নয়তো পঙ্গুত্ব বরন করছে। দেশটিতে ২০১৯ সাল ছিল মর্মান্তিক ও প্রাণঘাতী এক বছর।

বার্তাবাজার/কেএ

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর