পঞ্চগড়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস

উত্তরের জেলা পঞ্চগড় হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় বরাবরই শীতের প্রকোপ একটু বেশি থাকে। ২০১৮ সালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। যা ছিল গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। বাংলাদেশে তাপমাত্রার যে রেকর্ড সংরক্ষিত আছে তা থেকে জানা যায় এর আগে ১৯৬৮ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এবার শীতেও তাপমাত্রা শূন্যের দিকে নেমে আসছে। রবিবার পঞ্চগড়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা এই শীতের মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। গত শীত মৌসুমে এই দিনে পঞ্চগড়ের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিলো ৫ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি ৪ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় পঞ্চগড়ে। সারা দেশের একযোগে প্রতিদিন সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়ে থাকে। এবার পৌষের শুরু থেকেই পঞ্চগড়ে জেঁকে বসে শীত। ঘন কুয়াশার পাশাপাশি উত্তুরে হিমালয় থেকে আসা ঠান্ডা বাতাসে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। তবে গত কয়েক দিন থেকে সূর্যের দেখা মিললেও তাতে তেমন উত্তাপ ছিল না। দিনের আলো নিভলেই ঠান্ডা নেমে আসে আর তাপমাত্রাও কমে যায়।

শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভূত হয়। কুয়াশা কম থাকায় সকাল ৭টার সময়ই সূর্যের দেখা মিলে। সূর্যের দেখা পাওয়ায় ক্ষণিকের স্বস্তি আসে এ জেলার শীতার্ত মানুষের মাঝে। অনেককেই দল বেঁধে রোদে দাঁড়িয়ে উষ্ণতা নিতে দেখা যায়। বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাপমাত্রা গিয়ে ঠেকে ২৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বিকেলের পর আবার তাপমাত্রা কমতে থাকে। এখন দিনে হালকা রোদ আর রাতে প্রচণ্ডা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে।

প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আচরণে মানিয়ে উঠতে পারছে না এই জেলার বাসিন্দারা। অনেকেই এই আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে শীতজনিত নানা রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন সর্দি, জ্বর, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগীর ভিড় বাড়ছে। বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন শিশু ও বৃদ্ধরা।

এদিকে শীতের প্রকোপ বাড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার নিম্ন আয় ও খেটে খাওয়া মানুষেরা। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শীতবস্ত্র না থাকায় অনেকের রাত কাটছে খুব কষ্টে। দেখা গেছে জেলার প্রতি ৬ হাজার দরিদ্র শীতার্তের বিপরীতে সরকারিভাবে শীতবস্ত্রের বরাদ্দ মাত্র ১টি। এবার জেলায় সরকারি বেসরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে ৪০ হাজার। এতে শীতার্ত মানুষের একটা বড় এতে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার দিনমজুর হোসেন আলী বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগে। লেপ কাঁথা দিয়েও রাতে ঘুমাতে কষ্ট হয়। সকালে বের হওয়া যায় না, হাত-পা অবশ হয়ে আসে। দিনের বেলা কিছুক্ষণের জন্য সূর্যের দেখা মিললেও ঠান্ডা বাতাসের কারণে তেমন তাপ পাওয়া যায় না। সকালে উঠেই আগুন জ্বেলে হাত পায়ে সেক দেই। কাজে যেতে পারি না। আমাদের মতো দিন আনে দিন খাই এমন মানুষের জন্য কষ্ট হয়ে গেছে।

পঞ্চগড় আমতলা এলাকার শহিদুল ইসলাম বলেন, রাতে এমন ঠান্ডা নেমে আসে মনে হয় যেন কেউ বরফ দিয়ে শরীরে আঘাত করছে। হাত-পা জড়ো হয়ে আসে। বাইরে বের হওয়া যায় না। ঘুমাতে খুব কষ্ট হয়।

তেঁতুলিয়া উপজেলার মাগুরমারী এলাকার স্কুল শিক্ষিকা শাকিলা আক্তার জানান, রাত ও ভোরে অসম্ভব ঠান্ডা থাকে। তবে রবিবার সকালেই সূর্য উঠায় রোদের আলোতে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। এই শীতে আমাদের ছেলে-মেয়ের খুব দেখেশুনে রাখতে হচ্ছে। একটু ব্যতিক্রম হলেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রহিদুল ইসলাম বলেন, দিনের আকাশে কুয়াশা ও মেঘ না থাকলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তবে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই আবার তাপমাত্রা কমতে থাকে। এই সময় উত্তর পশ্চিম দিক থেকে জলীয় বাষ্পসহ ঠান্ডা বাতাস বয়ে চলে। তাই রাত ও ভোরে তাপমাত্রা অনেক কমে আসে এবং খুব ঠান্ডা অনুভূত হয়। রবিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জানুয়ারিতে তীব্র শৈত্য প্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে।

জেলা পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল বারী বাবু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতু বৈচিত্র্য পরিবর্তিত হচ্ছে। কখনো তাপমাত্রা অনেক কমে যাচ্ছে। আবার কখনো দিনের বেলা রোদ আর রাতে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। কখনো শীত আগে আসছে আবার কখনো পরে আসছে। এবার শীত ঠিক সময়েই এসেছে। তবে শীতের তীব্রতা অনেক বেশি।

পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল মান্নান বলেন, পঞ্চগড়ে শীতার্ত মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে ৪০ হাজারেরও বেশি শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। প্রকৃত শীতার্তদের হাতে আমরা শীতবস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর