রোদ্দুর রায়। সোশ্যাল মিডিয়ার খুব পরিচিত নাম। রবীন্দ্র সঙ্গীতকে সুর থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে নিজের মতো করে গাইতে শুরু করেন। বাংলাদেশের বরিশালে জন্ম নেওয়া রোদ্দুর থাকেন ভারতে। রোদ্দুর রায়ের কাণ্ড কারখানা নিয়ে অনেকেই মজা পান আবার অনেকে বিরক্ত। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা ঘামান না তিনি।
আজ ২৭ ডিসেম্বর, শুক্রবার কলকাতায় রোদ্দুর রায়ের প্রথম বাংলা উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছে। নাম – “মোক্সা রেনেসাঁ”। সপ্তর্ষি প্রকাশনের কর্ণধার সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের কথায় একে উপন্যাস না বলে আখ্যান বলাই ভাল।
রোদ্দুর রায়ের আসল না অন্য কিন্তু নকল নাম কেন? রোদ্দুর বলেন, নামকরণের সার্থকতা বিচারের সময় আসেনি আসলে। নাম আসলে যে লোক দিচ্ছে, আর যে আমি সে নামে পরিচিত, সে দুজন এক মানুষ নাই হতে পারে। এ নাম যে আমারই আমাকে দেওয়া, তেমন কোনও ডকুমেন্ট তো আসলে নেই। সার্থকতা তো ইতিহাস বিচার করে। ভবিষ্যতের ইতিহাস। নামকরণটা সার্থক নাকি অসার্থক, সেটা আমি ঠিক জানি না।
এই যে আপনার অসহনীয় একটা ব্যাপার, ডিস্টার্বিং, কিছুটা পরিমাণে বিকৃতভাবে নিজেকে পেশ করা- এই স্পেকট্যাকলটা যে আপনি তৈরি করেন, এটা কেন? রোদ্দুর বলেন, আমি তো আমার মতো হয়েছি, সেটা যদি আপনার অদ্ভুত লাগে সেটায় তো…। আমার সে ভাবে কোনও টার্গেট অডিয়েন্স নেই। আমি যেভাবে কাজগুলো করছি তাতে অডিয়েন্স নেই ভেবে আমি করে যাচ্ছি। আমি ২০১২ থেকে ইউটিউবে চ্যানেল করছি, সেখানে ২০১৪তে আমি দেখলাম লোকে রিঅ্যাক্ট করছেন, এখনও রিঅ্যাক্ট করছেন… আমি আমার মতো কাজগুলো করছি। আমি ইউটিউব চ্যানেলের বাণী দেখেছি, সেটা হচ্ছে ব্রডকাস্ট ইওরসেল্ফ। তো আমি ছোটবেলা থেকে নিজেকে ব্রডকাস্ট করার চেষ্টা করেছি, আমি কোনও মাধ্যম পাইনি, আমি দেখেছি আকাশবাণী থেকে ব্রডকাস্ট হচ্ছে, দূরদর্শন থেকে ব্রডকাস্ট হচ্ছে, কেউ আমাকে বলেনি যে ব্রডকাস্ট ইওরসেলফ।
রোদ্দুর বলেন, আমি চেয়েছি নিজেকে ব্রডকাস্ট করতে, লিটল ম্যাগ ট্যাগ হচ্ছে কলকাতায় দেখেছি, সেখানে দেখেছি তারা নানারকম কিছু করছে- তোমার কবিতা আমি ছাপব, তাহলে আমার কবিতা তুমি ছাপবে, তার পর টেলিফিল্ম করতে গেছি, সেখানে দেখেছি আমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে অন্যলোকে কাজ করছে, বাড়িতে বলছে, তোর স্ক্রিপ্ট গেঁড়িয়ে দিয়েছে যখন তাহলে স্ক্রিপ্টটা ভাল ছিল।
তিনি বলেন, এরকম একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে আমি বড় হয়ে উঠছিলাম এবং নিজেকে একদম ব্রডকাস্ট করতে পারছিলাম না। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার ভয়ানক বাসনা ছিল। তারপর হঠাৎ দেখলাম ইউটিউব বলছে ব্রডকাস্ট ইওরসেলফ। আমি ভাবলাম ওয়াও ম্যান, দে আর সেয়িং ইট… (অট্টহাসি)। তো আমি ব্রডকাস্ট করতে শুরু করলাম, এখনও করে যাচ্ছি। এবার জনগণ যা করছেন প্রতিক্রিয়ায়, সেটা আমার কাছে কিছুটা ফান, কিছুটা শেখার বিষয়, কিছুটা অবজার্ভ করার বিষয়- সেটা সোসাইটি কী সেই বিষয়ে।
সোসাইটিকে তো আমি দেখার মতো সময়ও পাচ্ছি না, আমি সাংবাদিকতা করি না, আমি সোশাল সায়েন্স করি না, আমি কিছু গবেষণা করেছি কনশাসনেস সায়েন্স নিয়ে, আমি কিছু নিজের লেখালিখি করেছি, অবসর সময়ে বসে গঞ্জিকা সেবন করে বা না করে ডিগবাজি খেয়ে, ঘরে একা থেকে। আমি একটা উদ্ভট জায়গায় থেকেছি যার নাম দিল্লি, সেখানে চারদিকে হিন্দি ভাষা চলছে, আমার মাতৃভাষা সেখানে নেই, আমি অ্যালুফ হয়ে গেছি, আমি রবীন্দ্রসংগীত সেখানে গাইতে পারিনি, শেয়ার করতে পারিনি, যেভাবে রবীন্দ্র সংগীত নাকে নাকে লোকে গেয়েছে, সিআর পার্কে গিয়ে দেখেছি গান হচ্ছে, সেখানে ‘আকাশে উড়িছে বকপাঁতি“, “বেদনা আমাড় তাড়ই সাথী”, এরকম উচ্চারণে রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছে, সবাই গোল করে ঘিরে দেখছেন দইবড়া ফুচকা খেতে খেতে- এরকম ধরনের বাংলা সংস্কৃতি আমি দেখেছি।
মনে কী দ্বিধা ড়েখে গেলে চলে- এরকম সব উচ্চারণে রবীন্দ্রসংগীত চলছে। তার পরে সকলে বেলফুলের মালা মাথায় লাগিয়ে, গাঢ় লিপস্টিক লাগিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন, এসব দেখে আমি বুঝেছি যে এটা ঠিক আমার ব্রডকাস্টিং স্টাইল না। আবার এরা আমার ব্রডকাস্টিং স্টাইল ঠিক নিতেও পারবে না, উৎসাহও দেবে না। আমার নিজস্ব এক্সপেরিমেন্ট নিজের মতো করে আমি করেছি। অবাঙালি এলাকায় থেকেছি, যাতে প্রতিবেশীরা মারতে না আসে।
আপনি কি আপনার যারা ফলোয়ার, তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু প্রেজেন্ট করেন কখনও? রোদ্দুর বলেন, কখনওই না। কারণ আমি এখানে কোনও ব্যবসায়িক দিক দেখিনি। এখান থেকে আমি যে অডিয়েন্স তৈরি করব বা বাড়াব কী করে, তার কোনও স্ট্র্যাটেজি আমি তৈরি করিনি। আমি নিজেকে প্রকাশ করে গেছি, এখনও তাই করে যাচ্ছি। সেখানে আমি এটাকে কোনও বিজনেস হাউস বা কোনও চ্যানেল যেভাবে দেখে, সেভাবে আমি একজন আর্টিস্ট হিসেবে কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করব, আমি এটা কখনও ভাবিনি।
দাদুর প্রতি আমার অসীম প্রেম আছে। রবিদাদু, বিঠোফেনদাদু, জীবনদা বা সুকুমার রায়, এঁদের যে আত্মা… এঁরা কিন্তু আমার কাছে ব্যক্তি মানুষ নন। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে এদের কখনও আমি চিনতে পারিনি। তাঁদের আত্মার যে প্রতিফলন তাঁদের কাজে পড়েছে, সেই কাজগুলো আমাকে স্পর্শ করেছে। আমি সকলের অসম্ভব ভক্ত। এঁদের কাজের সঙ্গে আমার আত্মাকে আমি জুড়তে পেরেছি। সেই জায়গা থেকে একটা মূল্যবোধ চলে এসেছে। সেটাকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি। আমি যখন রবীন্দ্রনাথ বলছি, সে রবীন্দ্রনাথ তো রবীন্দ্রনাথের আত্মা। এসেন্স অফ টেগোর। সেই এসেন্সের মধ্যে আত্মার যে মুক্তি রয়েছে, যে শিক্ষা রয়েছে, আমার ধারণা আমরা সেটা খুব কম নিয়েছি। সে এসেন্স যদি নেওয়া যেত, তাহলে আমাদের সমাজের এ অবস্থা হতো না। তা যদি হত, তাহলে কপিরাইট নিয়ে এরকম হুজ্জুতি, বা কে রবীন্দ্রনাথকে ডিভিয়েট করে গেল, রবীন্দ্রনাথে সাবঅলটার্ন ভাষা এসেছে বলে তাঁকে অপমান করা হয়েছে- এ ধরনের মানসিকতা তৈরি হতো না। তবে এখন আমার মনে হচ্ছে প্রশ্নগুলো আসা ভাল।
রোদ্দুর বলেন, রবীন্দ্রনাথের আত্মাকে আবিষ্কার করার জন্য আমাদের যে জার্নি, এগুলো তারই অংশ। এগুলোকে বাদ দিয়ে ওই এসেন্সে পৌঁছতে পারব না। রবীন্দ্রনাথকে আমরা এখনও আবিষ্কার করছি, কারণ রবীন্দ্রনাথ চিরন্তন। মানুষের প্রতিক্রিয়া একটা জিনিস নিশ্চিত করে যে আবিষ্কারপ্রক্রিয়া চলছে। যদি তা না হত, তাহলে মানুষ প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে যেত। মানুষের প্রতিক্রিয়ার এই সিরিয়াসনেস দেখে আমি চমৎকৃত। যাঁরা আমাকে গাল দিয়েছেন, সমালোচনা করেছেন, তাঁদের সকলকে আমার কুর্নিশ। আমার মনে হয়েছে, এঁরা সকলে রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসেন, তাঁদের নিজেদের মত করে ভালবাসেন। আমি আমার মতো করে ভালোবাসি। ভালোবাসার কত রং হতে পারে!এই পুরোটা মিলিয়ে যে অনুভব তৈরি হচ্ছে, সেটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, “তোমার ওই ঝর্নাতলার নির্জনে মাঠের এই কলস আমার হারিয়ে গেল কোনখানে”, এখানে যে আমি, যে তুমি, যে কলস, যে ঝর্নাতলা- সমস্তই তো প্রতীকী। সেখান থেকে যখন গভীরতর জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ভিজুয়ালগুলো বদলে, সেটা ওই সিম্বলগুলোকে পেরিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত রবীন্দ্রসংগীতে একটা আমি-তুমি রয়েছে। আমি জীবনদেবতা, এই আত্মা পরমাত্মার মধ্যে যে সংযোগ, সেই সংযোগকে উন্মোচিত করা হচ্ছে। এই উন্মোচন বিশাল শক্তিসম্ভার খুলে দিতে পারছে। এতদিন ধরে রবীন্দ্রসংগীত যে টিকে রয়েছে, সেটা ওই এনার্জিটা। সেটা ভাষার জন্য নয়, গায়নভঙ্গিও নয়। যে এনার্জি আমির বিকাশ ঘটায়। বিশ্বভারতী যদি আমিকে অবদমন করে থাকে, তাহলে তারা ভুল করেছে।
বার্তাবাজার/এমকে