ঢাকা দুই (উত্তর-দক্ষিণ) সিটি করপোরেশনের তফসিল ঘোষণার পর নীরবে চলছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা। মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে অনেকে শত ভাগ নিশ্চিত থাকলেও কেউ কেউ রয়েছে ধোঁয়াশায়। তাই দলীয় নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে প্রার্থীরা।
আশ্বাস পেলেই আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করবেন প্রচার-প্রচারণা। সদ্য ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩০শে জানুয়ারি দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ করা হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ৩১ শে ডিসেম্বর।
এবার দুই সিটিতেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হবে। রোববার নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা।
তফসিল ঘোষনার পর রাজধানীতে সিটি নির্বাচনের ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ভোট উৎসবে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রার্থীরা, নানা কৌশলে করছেন নিজেদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনা। নিজ এলাকার নানা ভোগান্তী নিয়ে এলাকাবাসির সাথে মতবিনিময় করছেন প্রার্থীরা।
ছিন্নমুল অসহায় মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করছেন কেউ কেউ। দলীয় সমর্থক ও কর্মীদের নিয়ে ঘরোয়া ভাবে করছেন আলাপ আলোচনা। আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন প্রচারনা শুরু না করলেও তফসিল ঘোষনার পর থেকে গতি বেড়েছে এই প্রচারনার।
দল থেকে কোন গ্রীন সিগনাল না পাওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোন প্রচারনায় না গিয়ে ভেবে চিন্তে পা ফেলছেন সবাই। এদিকে যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে সাধারণ ভোটাররা। বিগত দিনে যারা এলাকাবাসির পক্ষে ভালো কাজ করেছে, এবার তাদেরকেই বেছে নিতে চান তারা।
তবে সুষ্ঠ ভোট হওয়া নিয়ে শংসয় রয়েছে ভোটারদের মাঝে।মিরপুর এলাকার বাসিন্দা সাহেদ বলেন, নির্বাচন আসলে আগে ভালো লাগতো। একটা উৎসব মূখোর পরিবেশ ছিলো কিন্তু এখন আর সেই আমেজটা নেই। তারপরও জন প্রতিনিধি নির্বাচন তো আমাদের করতেই হবে।
এজন্য যাকে যোগ্য মনে হবে এবং এলাকার উন্নয় করবে তাকেই আমরা বেছে নিব। তবে শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে পারবো কিনা বা নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠ হবে এনিয়ে কনফিউশনের মধ্যে আছি।
এ বছর দুই সিটি নির্বাচনে নতুন যুক্ত হয়েছে ৩৬ টি ওয়ার্ড। এ সকল ওয়ার্ডে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এবারই প্রথম একসাথে নতুন পূরনো সব এলাকায় ভোট গ্রহন অনুষ্ঠিত হবে। নতুন ইউনিয়নসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মোট সাধারণ ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৪টি ও সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৮টি।
এই সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ৬২১ জন। এখানে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১ হাজার ৩৪৯ টি,ও ভোট কক্ষের সংখ্যা ৭ হাজার ৫১৬ টি। এছাড়া দক্ষিণ সিটিতে মোট সাধারণ ওয়ার্ড ৭৫, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ২৫। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৮ জন। সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১ হাজার ১২৪ টি, ভোটকক্ষ ৫৯৯৮ টি।
নির্বাচন নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)’র সংরক্ষিত নারী আসন ৩১,৩৩,৩৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলেয়া সরোয়ার ডেইজী বলেন, আমি এখনো আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন প্রচার-প্রচারনা শুরু করিনি তবে অসহায়-গরীব মানুষের মাঝে প্রতি বছরই শীতের পোশাক বিতরন করি এবারও তাই করছি।
এবার সংরক্ষিত আসনে নয়, ৩৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে চাই। এই ওয়ার্ডে বেশ কয়েকজন প্রার্থী রয়েছে সবাই অনেক লবিং-তদবির করছে তাই মনোনয়ন পাবো কিনা জানিনা। বিগত দিনের কাজকে যদি মুল্যায়ন করা হয়। তাহলে আশাবাদি আর যদি দল মনোনয়ন না দেয় তাহলে নির্বাচন করবো না। এজন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে ডিএনসিসির ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো.জামাল মোস্তফা বলেন, আমার প্রস্তুতি আগে থেকেই নেয়া আছে। আমার নির্বাচনী এলাকায় প্রচারনা চলছে। আমি আমার মনোনয়ন ও ভোটে জয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদি, কারন এই এলাকায় আমি অনেক কাজ করেছি। তাই ভোটাররা আমাকে হতাশ করবেন না।
আর যদি মনোনয়ন না পাই তাহলে নির্বাচন করবো না। সবে তো মাত্র তফসিল ঘোষনা হলো এখন দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। দুই সিটিতে ৩০ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ৩১ ডিসেম্বর। ২রা জানুয়ারি হবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। ৯ই জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাচার-প্রচারনার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)’র ৫৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও কদমতলী থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নুর হোসেন বলেন, তফসিল ঘোষনার পর থেকে আমার সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করছে। আমি ২৯ তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করবো।
কাল রাতেও আমার বাসায় নেতা কর্মীদের নিয়ে একটি মিটিং হয়েছে। এলাকাবাসির দাবি আমি যেন এবারও নির্বাচন করি। মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার এলাকায় চরম জনদূর্ভোগ ছিলো এটা আমি দুর করতে পেরেছি। উন্নয়ন মুলক অনেক কাজ করেছি।
তাই আমি আশাবাদি আর যদি না পাই তাহলে নির্বাচন করবো না। আমি দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)’র ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেন স্বপন বলেন, আমি মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে আশাবাদি কারণ এই এলাকায় আমি ইতোমধ্যে ৯০ ভাগ কাজ শেষ করেছি।
আমার নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। এখন শুধু উপরের নির্দেশের অপেক্ষায় আছি। ইঙ্গিত পেলে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচারণা শুরু করবো। এদিকে মনোনয়ন ও নির্বাচনে জয় পাওয়া নিয়ে আশংকায় রয়েছে সিটিতে যুক্ত হওয়া নতুন ওয়ার্ডের প্রার্থীরা। সিটি করপোরেশনে যুক্ত হলেও এলাকাবাসিকে কাঙ্খিত সেবা দিতে পারেননি এসব কাউন্সিলররা।
দক্ষিণে কিছু কাজ হলেও উত্তরে দুই বছরে তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি। এ বিষয়ে উত্তর সিটির ৫২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ফরিদ আহমেদ বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পরে আমার ওয়ার্ডে তেমন কোন বরাদ্দ পাইনি। সিটি করপোরেশন থেকে ২ কোটি ২৪ লাখ টাকার একটি বরাদ্দ পেয়েছি যা এখনো টেন্ডার হয়নি। এর মধ্যে নিজের সাধ্য মত কাজ করার চেষ্টা করেছি।
এখন সবকিছু ভোটারদের উপর নির্ভর করছে তারা যদি ভোট দেয় তাহলে আবার নির্বাচিত হয়ে নতুন করে কাজ করবো। বিভক্তির পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে একসঙ্গে ভোট হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৮ শে এপ্রিল। ২০১৫ সালের সেই নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা হয় ওই বছরের ১৪ই মে এবং দক্ষিণ সিটিতে ১৭ই মে।
সে হিসাবে ঢাকা উত্তরে বর্তমানে দায়িত্বশীলদের মেয়াদ শেষ হবে ২০২০ সালের ১৩ই মে, আর দক্ষিণে একই বছরের ১৬ই মে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিন গননা শুরু হয় উত্তরে ১৪ই নভেম্বর ও দক্ষিণে ১৮ই নভেম্বর ২০১৯ থেকে।
তফসিল ঘোষণা করায় আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে (মঙ্গলবার) আগাম প্রচারণামূলক সব পোস্টার-বিলবোর্ড নিজ দায়িত্বে নামিয়ে ফেলতে হবে। তা না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে ইসি।
বার্তাবাজার/কেএ