আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের অধীন দুইটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিকট নেই ইট ভাটা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য। গত ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং তারিখে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট থেকে তথ্য অধিকার আইনে প্রাপ্ত এসংক্রান্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে এবং সরেজমিন ভাটাগুলোতে গিয়ে বিষয়টি জানা যায়।

আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মাজহারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত তথ্য থেকে জানা যায়, আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইট ভাটা রয়েছে মোট ১২টি এবং লাইসেন্সবিহীন রয়েছে মোট ২১টি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ভাটাগুলো হলো- মেসার্স রচনা ব্রিকস-১ ও ২, মেসার্স সুরমা ব্রিকস-১ ও ২, মেসার্স মডার্ণ ব্রিকস, স্টাইল ব্রিকস-১ ও ২, এসএস ব্রিকস-১, আয়রন ব্রিকস, দেওয়ান ব্রিকস, রাজু ব্রিকস, ফোর স্টার ব্রিকস।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই তথ্যের ‘লাইসেন্স নং ও মেয়াদ (যদি থাকে)’ ঘরে উপরোক্ত বারটি ইট ভাটার ভিতর ৮টির মেয়াদ ছিলো ২০১৭ ইং পর্যন্ত, ২টির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৮ ইং তে, ১টির ২০১৬ তে এবং বাকি ১টির ব্যাপারে কবে মেয়াদ শেষ হয়েছে সে ব্যাপারে আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস কিছু জানায়নি।
এখানে দুইটি বিষয় সামনে আসে, প্রথমতঃ ইটের ভাটার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হবার পরও কিভাবে ভাটাগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে এবং দ্বিতীয়তঃ দু’একটি বিচ্ছিন্ন অভিযান ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর সহ এর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এতদিন কোন রহস্যময় কারণে নিশ্চুপ ছিলো?

অন্যদিকে, আশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রদত্ত তথ অনুযায়ী লাইসেন্স বিহীন ইট ভাটার সংখ্যা মোট ২১টি যাদের ব্যাপারে তথ্যে বলা হয়েছে, “লাইসেন্স নাই তবে লাইসেন্স করার জন্য আবেদন করেছেন”! কিন্তু কবে ওনারা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে ইউনিয়ন ভূমি অফিস।
এছাড়া এই তালিকার ০২ নং ক্রমিকে উল্লেখিত মোঃ সুলতান আহমেদ বেপারীর মালিকানাধীন মেসার্স এশিয়ান ব্রিকস এর নাম উল্লেখ রয়েছে। তথ্য প্রাপ্তির পরে গত মার্চ মাসে সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, চালাতে না পারায় এশিয়ান ব্রিকস নামের ইট ভাটাটি এর মালিক বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ ইউনিয়ন ভূমি অফিস তথা সাভার উপজেলা প্রশাসনের কাছে এই খবর নাই। এথেকে বুঝা যায়, ইট ভাটা সংক্রান্ত হালনাগাদ কোনো তথ্যই উপজেলা প্রশাসনের নিকট নেই।
হাস্যকর ব্যাপার হলো, ‘লাইসেন্স বিহীন’ কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে তাদের অনুমোদন পাবার আগেই বছরের পর বছর তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে?
কথিত লাইসেন্স বিহীন ভাটাগুলো হলো- মেসার্স মাফবর ব্রিকস, এশিয়ান ব্রিকস, রকি ব্রিকস, আল আশরাফ ব্রিকস, যমুনা ব্রিকস, ঢাকা ব্রিকস, পদ্মা ব্রিকস, আশুলিয়া ব্রিকস, পাওয়ার ব্রিকস, তিতাস ব্রিকস, তুরাগ ব্রিকস, ইষ্টার্ণ ব্রিকস, বাধন ব্রিকস, এসএসবি ব্রিকস, তৈয়বপুর ব্রিকস, শাপলা ব্রিকস, মেম্বার ব্রিকস, মেঘনা ব্রিকস, সনি ব্রিকস, তূষার ব্রিকস, রুপালী ব্রিকস।
অপরদিকে, আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের শিমুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস জানায়, তাদের অধীনে মোট ১৩ টি ইট ভাটা রয়েছে যার ভিতর মেসার্স ভাই ভাই ব্রিকস ও মেসার্স ইউ এম বি ব্রিকস তাদের ভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন বলে মালিকপক্ষ ভূমি অফিসকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন! এখানেও মালিকপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস তথ্য দিয়েছে। অথচ ওই দুইটি ভাটা আসলেই বন্ধ করা হয়েছে না চলছে সে বিষয়টিও দেখার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো আগ্রহ নেই।
মেসার্স এইচ ও এস ব্রিকস এর মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১০.০৬.২০১৪ তারিখে, আর এ সি ব্রিকস এর শেষ হয়েছে গত ৩০.০৩.২০১৩ তারিখে, সিবিসি ব্রিকস এর ৩০.০৩.২০১৮, পিবিসি ব্রিকস এর বিষয়ে কিছু উল্লেখ নাই, কেবল মালিকপক্ষ জানিয়েছেন তারা আবেদন করেছেন, তবে কবে তা জানায়নি।
এমজি ব্রিকস ও শওকত ব্রিকস এন্ড কোং এর ও একই ব্যাপার, মালিকপক্ষ মৌখিকভাবে জানিয়েছেন তারা আবেদন করেছেন। এনবিএম ব্রিকস এর মেয়াদ শেষ হয় ৩০.০৩.২০১৮ তে, আরআইএস ব্রিকস এন্ড কোং এর ৩০.০৬.২০১৭ তে, মোল্লা ব্রিকস এর ৩০.০৬.২০১৮ তে, এমজি ব্রিকস এর ৩০.০৩.২০১৮ তে এবং ঢাকা ব্রিকস এর লাইসেন্স নাই এভাবেই লেখা হয়েছে লাইসেন্স এর ঘরে।
তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি ঢাকায় মারাত্মক বায়ু দূষণের কারণে আদালত রাজধানীর আশপাশের সমস্ত অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশনা প্রদান করায় পরিবেশ অধিদপ্তর নড়েচড়ে বসেছে। চলছে তাদের ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান।
সর্বশেষ, ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় পরিবেশ দূষণ, নদী দখল ও টপ সয়েল ব্যবহারসহ নানা অভিযোগে পাঁচটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমান আদালত। সোমবার (২৩ ডিসেম্বর) সকাল থেকে আশুলিয়ার মরাগাঙ এলাকায় তুরাগ নদের তীরে অবৈধ ভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটায় অভিযান পরিচালিত হয় দুপুর পর্যন্ত।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী সচিব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রকৌ. কাজী তামজীদ আহমেদ এর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়। এসময় পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শরিফুল ইসলাম ও মাহাবুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন।

এসময় পরিবেশ দূষণ, নদী দখল ও টপ সয়েল ব্যবহারসহ নানা অভিযোগে দেওয়ান ব্রিকস, রাজু ব্রিকস, আল-আশরাফ ব্রিকস-১, আশরাফ ব্রিকস-২ ও এমসিবি ব্রিকসকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সাথে ইটভাটা গুলো গুড়িয়ে দিয়ে তা বন্ধেরও নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
বার্তাবাজার/কেএ