চলতি বছরের ৫ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের ব্যস্ততম শাহবাগ থানা থেকে চাইনিজ মডেলের একটি পিস্তল ও ১৬ রাউন্ড গুলি খোয়া যায়। গত সাড়ে সাত মাসেও খোয়া যাওয়া সেই অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি কে বা কারা সেই অস্ত্র-গুলি চুরি করেছে তা-ও জানা যায়নি।
থানা থেকে অস্ত্র-গুলি খোয়া যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় গাফিলতির দায়ে বরখাস্ত করা হয় সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) হিমাংশু সাহাকে। প্রথমে ঘটনা তদন্ত করে খোদ শাহবাগ থানা পুলিশ। পরবর্তীকালে মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগে। তাদের তদন্তেও নেই কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শাহবাগ থানা থেকে খোয়া যাওয়া ৭ দশমিক ৬২ চাইনিজ মডেলের পিস্তল ও ১৬টি গুলি উদ্ধারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহযোগিতায় তদন্ত করা হচ্ছে। উদ্ধার করা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন একজনকে শনাক্ত করা হলেও তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য না মেলায় তাকে আটক করা যায়নি। তবে সন্দেহের বাইরে নেই থানার পুলিশ সদস্যরাও।
৫ মে ডিউটি শেষে দুপুরে শাহবাগ থানায় ফেরেন এএসআই হিমাংশু সাহা। থানা ভবনের দ্বিতীয় তলার বিশ্রামকক্ষে পোশাক পরিবর্তন করেন তিনি। হিমাংশু নিজের ব্যবহারের পিস্তল-গুলি রাখেন বিছানার ওপরে। ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে যান গোসলে। মিনিট পাঁচেকে গোসল শেষে যখন বিশ্রাম কক্ষে ফেরেন, দেখেন তার পিস্তল-গুলি বিছানার ওপরে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর সন্ধান মেলেনি অস্ত্র-গুলির।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে সন্দেহভাজন এক যুবককে একাধিকবার থানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। যদিও তার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনা ছাড়া থানার ভেতর এমন ঘটনা সম্ভব নয়। অস্ত্র খোয়া যাওয়ার পর থানার সব কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার আনুমানিক সময় ৪টা ২০ মিনিট। এ সময়ে পুলিশ সদস্য ছাড়া শুধু একজন বহিরাগত যুবকই থানা কমপ্লেক্সের ভেতর ছিলেন। তবে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সন্দেহভাজন ওই যুবকের কথোপকথনের কোনো দৃশ্য মেলেনি সিসিটিভি ফুটেজে। এরপরও ওই সময় থানায় অবস্থানকারী কোনো পুলিশ সদস্যের সঙ্গে সেই যুবকের কোনো ধরনের যোগাযোগ কিংবা তথ্য সহযোগিতা ছিল কি-না তা তদন্তাধীন। এ ঘটনায় অস্ত্র-গুলি খুইয়ে গাফিলতির দায়ে বরখাস্ত হয়েছেন এএসআই হিমাংশু সাহা।
শাহবাগ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী খয়েরি-সাদা চেক শার্ট পরিহিত, মুখে দাড়ি ও কালো ব্যাগ কাঁধে সন্দেহভাজন সেই যুবক দু’বার থানায় ঢোকেন। প্রথম দফায় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ঢুকে দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিটে মূল ফটক দিয়েই বের হয়ে যান তিনি। মাঝের ৪৮ মিনিট থানার ভেতরে তার অবস্থান অন্য সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
বিকেল ৪টা ২৩ মিনিটে থানার পেছনের মসজিদের গেট দিয়ে আবার থানায় আসেন ওই যুবক। অস্ত্র বহনকারী এএসআই হিমাংশু তখন শৌচাগারে। মিনিট তিনেক পর সেই যুবক একই পথে বেরিয়ে যান। ওই সময়ই অস্ত্র-গুলি চুরি হয় বলে ধারণা পুলিশের। কারণ ওই পথে সিসি ক্যামেরা নেই।
এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) রাজিব আল মাসুদ বলেন, মাঝে আমরা একটা অস্ত্র ও কিছু গুলি উদ্ধার করেছিলাম। কিন্তু হতাশার কথা, খোয়া যাওয়া অস্ত্রের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি উদ্ধার অস্ত্রের।
তিনি বলেন, অস্ত্র-গুলি উদ্ধার ও চোরকে ধরতে আমাদের তৎপরতা চলছে। থানার সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজের যুবক সন্দেহভাজন। তিনিই যে চুরি করেছেন সেটাও নিশ্চিত নয়। তবে সন্দেহে তীর তার দিকে বেশি থাকলেও থানা পুলিশের কেউ সন্দেহের বাইরে নয়। এই চুরি রহস্য উদঘাটনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বার্তা বাজার / ডব্লিও.এস