মেয়ে রিপনা ও নাতনি মুন্নি হত্যার দ্রত বিচারসহ নিজের ও পরিবারের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সংবাদ করে আকুতি জানিয়েছেন ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর থানাধীন যাদবপুর গ্রামের মেহেরুননেছা।
শনিবার সকাল ১১ টায় সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পাঠ করে মেহেরুননেছা বলেন, সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশুনা করাকালিন তার মেয়ে রিপনাকে তুলে নিয়ে যেয়ে রাতভর আটক রেখে ধর্ষণ করে একই গ্রামের পুলিশ সদস্য আব্দুল আলিম। স্থানীয় শালিসে আলিমকে বিয়ে করার কথা বলা হলেও মেয়ের বয়স কম থাকায় তা হয় ওঠেনি। একপর্যায়ে রিপনার সঙ্গে তার ভাইপো আবু মুছার বিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে মুছা ও রিপনার জীবন ভালভাবে কাটছিল। নাতনি মুন্নি জন্মনিয়ে তাদের ঘর আলো করে।
লিখিত বক্তব্যে আরো বলা হয়, ২০১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সকালে রিপনার মেয়ে মুন্নিকে (৪) নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে যায়। এ সময় তাদেরই গ্রামের আব্দুল গণির মেয়ে শেলি ও রোকয়ার সহযোগিতায় রিপনা ও মুন্নিকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায় আব্দুল আলিম। তাদেরকে আনা হয় আলিমের পূর্বের কর্মস্থলে সাতক্ষীরা জেলায়। সাতক্ষীরার কোন এক স্থানে রিপনাক আটক রেখে গণধর্ষণ করে আলিমসহ কয়েকজন।
প্রতিবাদ করায় মা ও মেয়েকে নির্যাতন চালিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর সীমান্ত ইছামতী নদীতে ফেলৈ দেওয়া হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি দেবহাটা সীমান্ত ইছামতী নদীর ছুটিপুর নামক স্থান থেকে পুলিশ মুন্নি খাতুনের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় চৌকিদার ফজর আলী থানায় একটি সাধারণ ডায়রী করেন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ইছামতী নদীর কালিগঞ্জের বসন্তপুর নামক স্থান থেকে রিপা খাতুনের ক্ষত বিক্ষেত মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় লাশ সনাক্ত হওয়ার আগেই কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক ইসরাফিল হোসেন থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। নিহতদের লাশ বেওয়ারিশ হিসাবে সাতক্ষীরা শহরের রসুলপুর সরকারি গোরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে পত্রিকায় ও টেলিভিশনে ছবি দেখে মেয়ে ও নাতনিকে সনাক্ত করা হয়। ১০ ফেব্রয়ারি মুছা শেখের সাধারণ ডায়রী পর্যালোচনা শেষে পুলিশ ১৫ ফেব্রুয়ারি একই এলাকার পুলিশ কনস্টেবল আব্দুল আলিমের মোবাইল কললিষ্ট যাচাই করে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিপাকে সাতক্ষীরার পুলিশ লাইন এলাকায় নিয়ে এসে যোগারাজপুরের নজরুল ডাকাত ও তার সহযোগী রওশান এর সহযোগিতায় গণধর্ষণ ও হত্যা করা হয় মর্মে মোবাইল রেকর্ড থেকে পুলিশ জানতে পারে।
মেহরন নেছা বলেন, আব্দুল আলীম ও তার পরিবার বিত্তশালী হওয়ায় প্রভাবশালীও বটে। ৩০ বছর আগে তার ভাই হযরতকে হত্যা করে বস্তভর্তী করে বাগানের নীচে লাশ পুতে রাখার ঘটনায় জেলে ছিল তারা। একপর্যায়ে দেড় বছরের এক মেয়ের জীবনের কথা ভেবে স্থানীয় মাতবররা মাত্র ১৫ হাজার টাকায় মামলা মিটিয়ে নিতে বাধ্য করেন। খুনীর রক্ত শরীরে থাকা আলীম জামিনে মুক্তি পেলেও তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিয়ে আসছে। একপর্যায়ে তিনি সাতক্ষীরা আদালত একা আসতে ভয় পেতেন।
গত ৩ অক্টোবর বৃহষ্পতিবার ধার্য দিনে জামাতা আবু মুছা, ভাই শাকিল হোসেনকে নিয়ে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের মধ্যে এলে সকাল ১০টার দিকে মেহগনি বাগানে ডেকে নিয়ে আসামী আব্দুল আলিম, তার স্ত্রী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাকে ও শাকিলকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করে। তারা মহেশপুর হাসাপাতালে ভর্তি হন। বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় ছাপা হলে আত্মরক্ষায় ৪ অক্টোবর আলীম মিথ্যা অভিযোগ এনে তাদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়রী করে। হামলার ঘটনায় সাতক্ষীরা সদর থানায় তিনি বাদি হয়ে মামলা করেন। পুলিশ আলিমের বিরদ্ধ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। এ খবর জানতে পেরে আলীম ও তার পরিবারের সদস্যরা রাস্তাঘাট ও বাজার তাকেসহ পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। ফলে তারা রয়েছেন নিরাপত্তাহীনতায়।
মেহেরুননেছা অভিযোগ করে বলেন, মামলার আসামী পুলিশ হওয়ায় পরপর চারজন তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তণ হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা গত এক বছর ১০ মাসেও মামলার পুলিশ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেননি। ফলে তিনি মামলার তদন্তভার পিবিআই বা সিআইডি’র উপর ন্যস্ত করার জন্য আইজিপি ও পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাসহ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নিহত রিপনার বোন স্বপা খাতুন, রিতা খাতুন ও ভাগ্নি ঐশ্বী খাতুন।
জানতে চাইলে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) আজিজুর রহমান বলেন, তিনি আলীমের জামিন বাতিল করে রিমান্ড নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করেছেন। স্পর্শকাতর এ মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আলীমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা খুব জরুরী। যে কারণে পুলিশ প্রতিবেদন দিতে দেরী হচ্ছে।
বার্তাবাজার /এইচ.আর