দল না পাওয়া সেই রানাই এখন কাঁপাচ্ছেন বিপিএল!

গত ১৭ নভেম্বর রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বেশ ঘটা করেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্লেয়ার্স ড্রাফট। যেখান থেকে নিজেদের পছন্দমতো খেলোয়াড়দের নিয়ে স্কোয়াড সাজিয়েছিল অংশগ্রহণকারী দলগুলো। কিন্তু সেই ড্রাফটে সাত দলের কোনোটিতেই জায়গা হয়নি চাঁদপুরের ২২ বছর বয়সী বাঁহাতি পেসার মেহেদি হাসান রানার।

অবশ্য হার্নিয়ার অপারেশনের কারণে প্রায় দেড় বছর মাঠের বাইরে থাকা এবং পরে মাঠে ফিরে সে অর্থে তেমন কিছু করতে না পারায় তার প্রতি কোনো দলের আগ্রহ না থাকাটাই ছিলো স্বাভাবিক। কোনো দলে ডাক না পাওয়ায় নিজের মধ্যেই কাজ করছিলো একপ্রকার জেদ। সবাই খেলবে বিপিএলে, আর তিনি বসে থাকবেন তা মানতে পারছিলেন না রানা।

নিয়তির কী খেল! সেই ড্রাফটের এক মাসের মধ্যেই এখন বঙ্গবন্ধু বিপিএলের সবচেয়ে বড় চমক তথা সাড়া জাগানো বোলার এখন প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার বাঁ-হাতি পেসার মেহেদি হাসান। পরপর তিন ম্যাচে দল জেতানো বোলিং করে নিজেকে রীতিমতো ‘টক অব দ্য বিপিএল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন রানা।

প্লেয়ার্স ড্রাফটে দল না পেয়ে তিনি একদিন অনুশীলন করেছিলেন রংপুর রেঞ্জার্সের হয়ে। অথচ এখন বিপিএল মাতাচ্ছেন নিজ বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের জার্সি গায়ে। এটি সম্ভব হয়েছে মূলতঃ চট্টগ্রামের অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ইমরুল কায়েসের কারণে। তারা দুজন মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রানাকে দলে নেয়ার।

ভাগ্যিস তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই রংপুর রানাকে দলে ভিড়িয়ে নেয়নি। না হলে রংপুরের তারকা দেশি পেসারদের ভিড়ে বাঁ-হাতি পেসে আলোড়ন তোলা বোলিং হয়তো করা হতো না রানার। যা তিনি করতে পারছেন চট্টগ্রামের জার্সি গায়ে।

ড্রাফটে দল না পাওয়া, রংপুরের হয়ে অনুশীলন করা এবং পরে চট্টগ্রামে সুযোগ পাওয়া মিলিয়ে শেষ হয়ে যায় তার দলের ২টি ম্যাচ। তবে এ দুই ম্যাচ না খেলেই বর্তমানে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারীর তালিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য রানার। যার আশেপাশেও নেই কেউ।

এখনও পর্যন্ত ৪ ম্যাচ খেলে শিকার করেছেন ১২টি উইকেট। যার মধ্যে শেষ তিন ম্যাচেই নিয়েছেন ১১টি। এ তিন ম্যাচে তিনি ১২ ওভারে মাত্র ৬.১৬ ইকোনমিতে ৭৪ রান খরচ করেছেন। তার এই পরিসংখ্যানের মাহাত্ম্য বাড়তি মর্যাদা পেয়েছে, তিনটি ম্যাচই সাগরিকায় ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে। শেষের দুই ম্যাচে তো আবার প্রতিপক্ষ দল ২০০’র বেশি রান করার ম্যাচে রানা রান খরচ করেছেন ওভারপ্রতি মাত্র ৬ করে।

চলতি বিপিএলে রানার উত্থানের শুরুটা নিজ বিভাগীয় শহরে দলের প্রথম ম্যাচেই। সিলেট থান্ডার্সের বিপক্ষে ৪ ওভারে মাত্র ২৩ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়ে একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রতিপক্ষের ইনিংস। গুরুত্বপূর্ণ সব উইকেট নিয়ে সেদিন ম্যাচসেরাও হয়েছিলেন তিনি।

তার বোলিংয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় ঢাকা প্লাটুনের বিপক্ষে হাই স্কোরিং ম্যাচে। নিজেরা আগে ব্যাট করে ২২১ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছিল চট্টগ্রাম। তবু তারকাসমৃদ্ধ ঢাকার বিপক্ষে এটিকে মনে হয়েছিল মামুলি সংগ্রহ। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা ও লঙ্কান মারকুটে অলরাউন্ডার থিসারা পেরেরার ঝড়ে শেষদিকে এই বিশাল রান তাড়ার ব্যাপারে বেশ এগিয়ে গিয়েছিল ঢাকা।

ঠিক তখনই ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক ইমরুল কায়েসের তুরুপের তাস হিসেবে আবির্ভূত হন রানা। ভয়ঙ্কর থিসারার বিপক্ষে ডেথ ওভারে ১২ বলে খরচ করেন মাত্র ১২ রান, আউট করে থিসারাকে, দলকে এনে দেন ১৬ রানের দুর্দান্ত এক জয়। সবমিলিয়ে ৪ ওভারে মাত্র ২৩ রান খরচায় ৩ উইকেট নিয়ে আবারও ম্যাচসেরার পুরষ্কার জেতেন তিনি।

ধারাবাহিকতায় বজায় রেখে শুক্রবার কুমিল্লা ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন নিজেকেও। আবারও চট্টগ্রাম দাঁড় করায় ২৩৮ রানের বিশাল সংগ্রহ। জবাবে কুমিল্লা করে ৭ উইকেটে ২২২ রান। এই রান বন্যার ম্যাচেও একপর্যায়ে ৩ ওভারে ১ মেইডেনের সহায়তায় মাত্র ৬ রান খরচায় ৪ উইকেট নিয়ে ফেলেছিলেন রানা।

শেষ ওভারে ২২ রান খরচ করে বসায় বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৪-১-২৮-৪! এক ওভারে ২২ রান দেয়ার পরেও দুই দল মিলে সেরা বোলিং ফিগারের মালিক বাঁ-হাতি এ পেসারই। মাত্র ২৭ বলে ৭১ রানের টর্ণেডো খেলায় ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে রানার সতীর্থ চ্যাডউইক ওয়ালটন। তবে চট্টগ্রামের জয়ে রানার বোলিংয়ের অবদানও ছিলো অপরিসীম।

টুর্নামেন্টে নিজ দলের প্রথম দুই ম্যাচ শেষ হওয়ার পর যোগ দিয়ে, এখন চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স তো বটেই- চলতি বিপিএলেরই সেরা বোলার রানা। চার ম্যাচে মাত্র ৬.৬৮ ইকোনমি ও ৮.৯১ গড়ে শিকার করে ফেলেছেন ১২টি উইকেট। প্লেয়ার্স ড্রাফটে কারও আগ্রহের পাত্র না হওয়া রানার সামনেই এখন অবারিত সুযোগ ধারাবাহিকভাবে নিজের সামর্থ্য প্রমাণের মাধ্যমে আরও বড় কিছু অর্জন করার।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর