আগামী দুই মাসে ২৯ জন সচিব অবসরে যাবেন: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের ভিতরে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রশাসনে সিনিয়র কর্মকর্তারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা চান প্রশাসনের শীর্ষপদে আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নয়, বরং নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগ্য ও দক্ষদের নিয়োগ দেওয়া হোক। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে অনেক যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তা সচিব পদে পদোন্নতি না নিয়েই অবসরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এ প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য তাঁরা এখন একাট্টা। তার পরও সচিব পদে থাকা কিছু কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে তৎপর।

কিন্তু প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা আর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেখতে চান না। খুব জরুরি না হলে কোনো কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিতে তাঁরা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি কামনা করছেন। তাঁদের মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ হলে প্রশাসনের কাজে গতি আসবে। এতে সরকারই লাভবান হবে। নিয়মিত কর্মকর্তারা উচ্চপদে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

ক্ষোভ ও অসন্তোষও কমবে। না হলে পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও দক্ষ, মেধাবী কর্মকর্তারা সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। জানা গেছে, এই ডিসেম্বরেই সরকারের ১০ জন সচিব অবসরে যাবেন। আর জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ১৯ জন সচিবের চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু অবসরের অপেক্ষায় থাকা এই সচিবদের অনেকেই চাচ্ছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে একই পদে বহাল থাকতে। এজন্য তাঁরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিভিন্নভাবে তদবির করছেন। এমনকি যাঁরা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরুদ্ধে ছিলেন, তাঁরাও এখন নিজের স্বার্থে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চাচ্ছেন।

কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে বারবার বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলছেন, অবসরের পথে থাকা কর্মকর্তারা মনে করেন, তাঁদেরকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিলে সরকারের বিরাট ক্ষতি হবে। কাজ আটকে থাকবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে। তাঁদের মতে, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে নিজেদের সম্পর্কে এমন ধারণা দিয়েই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে মরিয়া ওই কর্মকর্তারা। ফলে যেসব কর্মকর্তা সচিব পদে যাওয়ার যোগ্যতা রাখেন তাঁরা বঞ্চিত হয়ে চাকরির বয়স পার করেন অতিরিক্ত সচিব থেকেই। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে মনে করেন প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তারা। সচিব পদে যাওয়ার যোগ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা চান এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ। তাঁরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করলেই যোগ্য কর্মকর্তারা সুযোগ পাবেন দেশ ও সরকারের জন্য কাজ করার। এতে প্রশাসনের কাজেও গতি আসবে।

বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব পদে মোট কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৯৪। এর মধ্যে সর্বশেষ পদোন্নতি পেয়ে যুগ্মসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন ১৫৮ জন; যাঁদের নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ১১তম ব্যাচকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর আগে দশম ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে অতিরিক্ত সচিব করা হয় গত বছর ২৯ আগস্ট।

অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ায় নিয়মানুযায়ী তাঁরা সচিব হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। কারণ তাঁদের ওপরে সিনিয়র হিসেবে ’৮৫, ’৮৬ ও নবম ব্যাচের বহু কর্মকর্তা সচিব হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। সচিব হিসেবে বর্তমানে ’৮৬ ব্যাচ পর্যন্ত যুক্ত করা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছর দায়িত্ব পালন করলে সরকার চাইলে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, ১৫ ডিসেম্বর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের, কিন্তু ইতিমধ্যে তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। ২০ ডিসেম্বর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহাবুদ্দিন আহমেদ, ৩০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মো. নজিবুর রহমান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া, ৩১ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বেগম জুয়েনা আজিজ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রইছউল আলম ম লের চাকরির মেয়াদ শেষ হবে। অর্থাৎ তাঁদের অবসরে যাওয়ার কথা। এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেকের মেয়াদ শেষ হবে ৩০ ডিসেম্বর। আগামী বছরের ৫ জানুয়ারি অবসরে যাবেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক, ৩১ জানুয়ারি ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান, ১০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের নিয়মিত চাকরির মেয়াদ শেষ হবে।

এ ছাড়া চুক্তিতে থাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২ জানুয়ারি। ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) মো. ফারুক হোসেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম আরিফ-উর-রহমান, ২২ ফেব্রুয়ারি ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাবেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবদুস সামাদ। জানা গেছে, তদবির না করলেও ’৮৫ ব্যাচের দুজন সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বার্তাবাজার /এইচ.আর

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর