শীতে বাড়ছে রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চারমাসে রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের হার বেশি থাকে। হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডায়রিয়া আক্রান্ত প্রতি চার শিশুর অন্তত একটি রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত

রোটা ভাইরাস হলো একধরনের ভাইরাস যা শিশুদের ডায়রিয়ার প্রধান কারণ। বলা হয়ে থাকে বিশ্বের প্রতিটি শিশু তাদের জীবনের প্রথম পাঁচবছরে একবারের জন্য হলেও রোটাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়। প্রতিবার সংক্রমণের ক্ষেত্রে শরীরে ইমিউনিটি তৈরি হয় তাই দ্বিতীয় বা তার পরবর্তী সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ততটা তীব্র হয় না। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে রোটাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা বিরল।

রোটা ভাইরাসের আটটি প্রজাতি রয়েছে, সেগুলো হলো যথাক্রমে A, B, C, D, E, F, G ও H. রোটা ভাইরাস দিয়ে যত সংক্রমণ হয় তার নব্বই শতাংশই Rotavirus A দিয়ে হয়।

রোটা ভাইরাস ডায়রিয়া একটি পানিবাহিত রোগ। মলদ্বারা দূষিত পানি বা খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই ভাইরাস সহজেই ছড়াতে পারে। এটি ক্ষুদ্রান্ত্রের এন্টারোসাইট নামক কোষকে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে ও গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস করে যা স্টোমাক ফ্লু নামে পরিচিত যদিও এর সাথে ইনফ্লুয়েঞ্জার কোনো সম্পর্ক নেই।

১৯৭৩ সালে Ruth Bishop ও তার সহকর্মীবৃন্দ ইলেকট্রন মাইক্রোগ্রাফ চিত্রের সাহায্যে রোটাভাইরাস আবিস্কার করেন। জনস্বাস্থ্য সম্প্রদায় বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঐতিহাসিকভাবে এই জীবাণুকে খুব একটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়নি। মানুষ ছাড়াও প্রাণী ও গৃহপালিত পশুপাখিও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই চারমাসে রোটা ভাইরাসে আক্রান্তের হার বেশি থাকে। যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৮০ ভাগই এই সময়ে হয়। ৬ থেকে ২৪ মাস বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় রোটা ভাইরাসে।

আইইডিসিআর এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম আলমগীর বলেন, শীত মৌসুম নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। এই সময়টা “কমন কোল্ড” বা সাধারণ সর্দিজ্বরের মৌসুম। তবে এই সময়ের জ্বরকে অনেকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভেবে ভুল করে থাকেন। সাধারণ সর্দিজ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হলেও অনেকে তা না জেনেই সেবন করে থাকেন।

আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, শীতে ভাইরাসজনিত কারণে তিনটি সংক্রামক রোগ হয়ে থাকে। মানুষ সচেতন হলে এই তিন সংক্রামক রোগ থেকে প্রতিরোধ পাওয়া সম্ভব। রোগ তিনটি হলো—সাধারণ সর্দিজ্বর, রোটা ভাইরাস ও নিপাহ ভাইরাস।

আইইডিসিআর এর ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী পরিচালক ড. মনজুর হোসেন খান বলেন, ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ১০ হাজার ৮১৬ জন শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। এরমধ্যে ৬ হাজার ৫২৮ জন শিশু অর্থাৎ ৬০ ভাগ শিশুর রোটা ভাইরাস পজিটিভ পাওয়া গেছে। এই সময়ের মধ্যে পাঁচজন শিশুর রোটা ভাইরাসে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডায়রিয়া আক্রান্ত প্রতি চার শিশুর একটি রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

শীতকালীন মৌসুমে শিশুরা এই ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। বিশ্বে শিশু মৃত্যুর চতুর্থ কারণ ডায়রিয়া। রোটা ভাইরাস পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। নবজাতক এবং শিশুরা এই ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হয়। শীত যত বেশি পড়ে, রোটা ভাইরাসে শিশুর আক্রান্তের হারও তত বেড়ে যায়।

প্রতিরোধে করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, পানি, খাবার ও হাতের স্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায় এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে বাতাসে থাকতে পারে। রোটা ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার চিকিৎসাই এক্ষেত্রে দেওয়া হয়। হাত ধুয়ে খাবার খাওয়া এবং খাবার গরম করে খাওয়ার মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বার্তাবাজার/কে.জে.পি

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর