জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে এলাকায় শান্তি কমিটির লোকজনের প্রতাপ ও তৎপরতা ছিল। একদিন রাতে আমি আর বড় ভাই গোলাম মোস্তফা ঘরে বসে চাপিলা মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছিলাম।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ‘আশংকায়’ শান্তি কমিটির লোকজন আমাদের ধরে নিয়ে যেতে পারে খবর পেয়ে দুই ভাই থালার অর্ধেক খাবার রেখে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে ভারতের পথে পা বাড়াই। আমরা তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। এর মধ্যে আমিসহ দুই ভাই ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত আর এক ভাই দেশে থেকেই মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশে ফিরে নিজ এলাকায় আমরা পাক হানাদার বাহিনীর সাথে ‘দক্ষিন্নপাড়া যুদ্ধ’ ‘বাশিয়া যুদ্ধ’ ‘সিমাখালী যুদ্ধ’ ‘কন্যামন্ডল যুদ্ধসহ চারটি বড় যুদ্ধ করেছি।
কথাগুলো বলেন ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার দত্তেরবাজার ইউনিয়নের যাত্রাসিদ্ধি গ্রামের মৃত মাছুম আলী শেখের ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন (৬৮) ওরফে চাঁনু মিয়া।
তিনি বলেন, উল্লেখিত চারটি যুদ্ধের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ও বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল কন্যামন্ডল যুদ্ধ। কারণ এটি ছিল হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী সম্মুখ যুদ্ধ। গৌরবময় এ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর একজন অফিসার, চারজন সৈন্য খতম হয়, দুইজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দুইজন সাধারণ মানুষসহ মোট নিহত হয়।
এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনী আমিসহ তিন-চারজন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘেরাও করে ফেলে। পরে আখ ক্ষেতের গভীরে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লুকিয়ে আত্মরক্ষা করি। আখ ক্ষেতের উছিলায় আল্লা আমাদের প্রাণে বাঁচিয়েছেন। তাই একাত্তরের যুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনো আখ খাইনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন আলোচিত কন্যামন্ডল যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ভারত থেকে দেশে ফিরে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দক্ষিন্নপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করি এবং ঐ রাতেই হানাদার বাহিনীর বাশিয়া ক্যাম্প আক্রমণ করি। কন্যামন্ডলের যুদ্ধের দিন গফরগাঁও সদর থেকে পাকিস্তানি আর্মিরা সড়ক পথে আসার খবর পেয়ে আমরা হামলার সিদ্ধান্ত নিলাম। কথা হলো তিন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এ যুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করবো। মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল ই আলম কামালের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ পাঁচবাগের লামকাইন গ্রামে অবস্থান করবেন। মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেমের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ লংগাইরে অবস্থান করবেন। আর মুক্তিযোদ্ধা মুনজুর কাদেরের নেতৃত্বে আমরা তৃতীয় গ্রুপটি কন্যামন্ডল অবস্থান করবো।
পাক বাহিনী আসার সময় ইকবাল ই আলম কামাল গ্রুপ ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম গ্রুপ দুই দিক থেকে পাক হানাদার বাহিনীর উপর হামলা করবে আর আমরা তাদের সহায়তায় এগিয়ে যাবো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পাক বাহিনী দ্রুত চলে আসায় কণ্যামন্ডলে আমাদের তৃতীয় গ্রুপটি পাক বাহিনীর সামনে পরে যাই। ফলে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় আমাদের যুদ্ধ শুরু করতে হয়। এ অবস্থায় আমরা বেশীক্ষণ টিকতে পারিনি। এক পর্যায়ে আমি ও মুনজুর কাদেরসহ তিনজন প্রাণ বাঁচাতে পিছু হটে একটি আখ ক্ষেতে আশ্রয় নেই। বিশাল আয়তনের আখ ক্ষেত হওয়ায় হয়তো পাক সেনারা ভয়ে প্রবেশ করেনি। তাই আমরা প্রাণে বেঁচে গেছি। বেশ কিছুক্ষণ আখ ক্ষেতে আত্মগোপন করে থাকার পর লামকাইন থেকে মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল ই আলম কামাল গ্রুপ ও লংগাইর থেকে মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম গ্রুপ এগিয়ে এলে পাক বাহিনীর সাথে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের ত্রিমুখী যুদ্ধ। এ যুদ্ধ চলে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত।
যুদ্ধে কন্যামন্ডল গ্রামের আলতাফ হোসেন, বাগেরগাঁও গ্রামের মোশারফ হোসেন ও টাঙ্গাব গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইছব আলী, বারইহাটি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক শহীদ হন। অন্যদিকে এ বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন ও চারজন সৈন্য মারা যায়। যুদ্ধে হানাদার বাহিনী পরাজিত হয়ে তাদের নিহত সৈন্যদের লাশ নিয়ে পালিয়ে যায়। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর আশপাশের গ্রামের মানুষ রাস্তায় বের হয়ে আনন্দে মেতে উঠেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রোকসানা বেগম বলেন, কন্যামন্ডলের যুদ্ধ ছিল খুবই আলোচিত ও গৌরবময় যুদ্ধ। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ত্রিমুখী এ যুদ্ধে হানাদার বাহিনী পরাজিত হয় এবং ওদের একজন অফিসারসহ পাঁচজন নিহত হয়।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি