রাজাকার, আলবদর, আলশামসের সদস্যসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের অপরাধের বিবরণসহ নাম প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, শহীদ পরিবারের সন্তানরা। তারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ছাড়াও শান্তি কমিটিসহ আরও বেশ কয়েকটি ভয়ংকর বাহিনী ছিল। এদের বাইরেও জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে আলাদা কিছু গ্রুপ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরাই মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। তাই প্রত্যেকের নাম এবং তাদের সংঘটিত অপরাধের বিবরণসহ তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, রাজাকার, আলবদর, আলশামসের তালিকা প্রকাশের মতো এত বড় একটি ঐতিহাসিক কর্মযজ্ঞ কেবল মন্ত্রণালয়, প্রশাসন বা জেলা প্রশাসক-উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দিয়ে সম্পন্ন করা যাবে না। এ কাজে মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
রোববার দেয়া আলাদা প্রতিক্রিয়ায় তারা এ কথা বলেন। এর আগে এদিন সকালে সরকারের হাতে থাকা নথির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী ও শান্তি কমিটির ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নামের প্রথম তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লেখক, সাংবাদিক ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীর বলেন, দেরিতে হলেও রাজাকার, আলবদর এবং আলশামসদের তালিকা প্রকাশকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে শুধু নাম প্রকাশ করে লাভ হবে না। নামের পাশাপাশি তাদের অপরাধের বিষয়ও উল্লেখ করতে হবে। তা না হলে নতুন প্রজন্ম কি জানবে?
তিনি বলেন, জেনারেল নিয়াজির বইয়ে ৫০ হাজার রাজাকারের কথা বলা আছে। আরও ৫০ হাজার রাজাকার রিক্রুটিংয়ের প্রক্রিয়ায় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে বইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মেজর (অব.) এএসএম শামসুল আরেফিনের গবেষণায় ৩০ হাজারেরও বেশি রাজাকারের তালিকা পাওয়া গেছে। আমরা চাই স্বাধীনতাবিরোধীদের পুরো তালিকা অপরাধসহ প্রকাশ করা হোক। তিনি বলেন, রাজাকারের চেয়েও আরও ভয়াবহ ছিল আলবদর ও আলশামস বাহিনী। তারাই মানবতাবিরোধী মূল অপরাধ করেছে কাজেই তাদের নামের পাশে অপরাধের বিবরণ দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকে ভয়ে বা প্রাণ বাঁচাতে রাজাকারের তালিকায় নাম লেখায়। কিন্তু তাদের সবাই যে অপরাধী তা নয়।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের মহাসচিব সিনিয়র সাংবাদিক হারুন হাবীব এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছরের মাথায় এসে রাজাকার, আলবদর, আলশামসসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় কাজ। তবে আমরা আশা করব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। শুধু এদের নাম নয়, মুজাহিদ বাহিনী, শান্তিবাহিনীসহ ওই সময় যারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করেছে, হত্যা-ধর্ষণ, লুটতরাজ করেছে- তাদের সবার নাম প্রকাশ করতে হবে। এদের মধ্যে যারা চিহ্নিত অপরাধী রয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করতে গিয়ে যেমন দেখা গেছে, অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ঢুকে গেছে। তেমনি স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় যেন কোনো নিরীহ ব্যক্তির নাম ঢুকে না পড়ে- এ বিষয়েও সরকারকে সজাগ এবং সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, আংশিক তালিকা প্রকাশ করা হলেও আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের কাজটি সম্পাদন করা গেলে আগামী দিনের বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে নেয়ার কাজ সহজ হবে।
জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর ছোট মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পর হলেও রাজাকার, আলবদর ও আলশামসসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমরা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের এটি দীর্ঘদিনের দাবি। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষেরও দীর্ঘদিনের দাবি এদের তালিকা প্রকাশ। আমাদের কারা শত্রু, কারা মিত্র, কারা স্বাধীনতার পক্ষের, কারা বিপক্ষের- এটা স্পষ্ট করার জন্যই আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়ে এসেছি। অবশেষে প্রথম পর্যায়ে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। আশা করব দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে।’
ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, রাজাকার, আলবদর এবং আলশামসের তালিকা আলাদাভাবেও প্রকাশ করতে হবে। বিশেষ করে আলবদর বাহিনী ছিল ভয়ংকর। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ মূল কিলিং এই বাহিনীর হাতেই সংঘটিত হয়েছে। রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।
বার্তাবাজার/এইচ.আর