দূষনের শীর্ষে এবার ঢাকার বাতাস

বায়ুতে দূষণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে রাজধানী ঢাকায়। এবার এই দূষেনে ঢাকা শীর্ষে উঠেছে অন্যান্য শহর থেকে। রোববার সকাল সাড়ে ৮টায় ২৩৭ পিএম নিয়ে দূষণের শীর্ষে ছিল ঢাকার অবস্থান। তখন ২৩৬ পিএম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল মঙ্গোলিয়ার উলানবাটোর। ১৯৭ পিএম নিয়ে আফগানিস্তানের কাবুল তৃতীয়, ১৯১ পিএম নিয়ে পাকিস্তানের লাহোর চতুর্থ, ১৮৩ পিএম নিয়ে চীনের চেংদু পঞ্চম এবং ১৮২ পিএম নিয়ে ষষ্ঠ ছিল ভারতের দিল্লি।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে দূষিত নগরীর শীর্ষ থেকে নেমে আসতে থাকে ঢাকা। সন্ধ্যা ৭টায় দেখা যায় ২৮৭ পিএম নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটর। পরের দ্বিতীয় স্থানে ১৯২ পিএম নিয়ে রয়েছে চীনের চেংদু শহর। তৃতীয় স্থানে কিরগিজিস্তানের বিশকেক ও চতুর্থ স্থানে বসনিয়া হারজেগোভিনার সারায়েভো। একই সময়ে ১৮০ পিএম নিয়ে পঞ্চম স্থানে দেখা যায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাম। বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এয়ার ভিজুয়ালের পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে দেয়া এক চিঠিতে পরিবেশ অধিদফতর বলেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন নির্মাণকাজ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ফলে সৃষ্ট ধূলিকণা ঢাকায় বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। রাজধানীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্মাণকাজ করার ক্ষেত্রে ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান সেটি মানছে না। ছাড়পত্র নিলেও শর্তাবলিকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে ইচ্ছেমতো পরিবেশ দূষণ করছে। চিঠিতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ১০টি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র নেয়নি। তাদের চিঠি দিলেও কোনো পাত্তা দিচ্ছে না।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো উন্নয়ন প্রকল্প একনেকে পাস হবে না বলে একটি নির্দেশনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এ ছাড়াও হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা রয়েছে। এসব নির্দেশনার আগে যেসব প্রকল্প কাজ শুরু করেছে তারা পরিবেশ অধিদফতরকে ছাড়পত্র নেয়নি। তাই বলে ইচ্ছেমতো পরিবেশ দূর্ষণ করে নির্মাণ করবে তা হয় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উন্নয়নমূলক কাজ শুরুর আগে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র আইনগত বাধ্যতামূলক হলেও এটাকে তোয়াক্কা করছেন না সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ছাড়পত্র ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এ রকম এক ডজনের বেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে পরিবেশ অধিদফতর। রাজধানীতে বায়ু ও শব্দ দূষণের সরকারি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকলেও পরিবেশ অধিদফতরকে নীরব ভূমিকায় থাকতে হয়। সার্বিক পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়কে অভিহিত করেছে পরিবেশ অধিদফতর। সরকারি-বেসরকারি যাদের ছাড়পত্র নেই সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযানে নামার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।

পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মিরপুর-৯ স্বপ্ন নগর এলাকায় এক হাজার আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, লালমাটিয়া নিউ কলোনি ১৩২ আবাসিক ফ্ল্যাট (রিভাইজড ১৫৩) নির্মাণ প্রকল্প, ঢাকা মিরপুর ১৫ নম্বর সেকশনে সরকারি-আধাসরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘রূপনগর’ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, মিরপুর ১৫ নম্বর সেকশনে (গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহতদের) জন্য ১০০ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, লালমাটিয়া নিউ কলোনি ১২০ ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, মিরপুর (সেকশন-৯) ১৪ তলা ১৫ ফ্ল্যাট (দ্বিতীয় পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প, লালমাটিয়া হাউজিং এস্টেট ৫৪ ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, লালমাটিয়া হাউজিং এস্টেট ৭২ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প, লালমাটিয়া কমিউনিটি সেন্টার কাম অফিস স্পেস ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, মিরপুর সেকশন-১৬ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প ইত্যাদি বহুতল ভবন-আবাসন প্রকল্পের জন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ অবস্থানগত ছাড়পত্র এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র নেয়নি। এসব প্রকল্পের ছাড়পত্র না নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিলেও কোনো উত্তর পাওয়া পায়নি অধিদফতর।

রাজধানীতে পরিবেশ ব্যাপকভাবে দূষণের ফলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের রোগব্যাধি বেড়ে গেছে। নানা সংক্রামণ নিয়ে জাতীয় বক্ষব্যাধির হাসপাতালে চলতি বছর ২০ শতাংশ রোগী বেশি ভর্তি হয়েছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুদূষণের ফলে শুধু ফুসফুসকেন্দ্রিক রোগ বিস্তার লাভ করতে পারে এমনটি নয়। এর মাধ্যমে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো মারাত্মক রোগও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি অনেক ছোটখাটো রোগবালাই প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে মানসিক অবসাদ ও শিশুদের মধ্যে অ্যাজমার মতো রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে। বায়ুদূষণের লাগাম টেনে না ধরতে পারলে শ্বাসজনিত নানা রোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সার ও জিনেটিক পরিবর্তনজনিত নানা অজানা রোগে ভুগতে হতে পারে চরমভাবে। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসাব্যয় বেড়ে যাবে তেমনিভাবে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদনশীলতাও ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে।

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী বলেন, বায়ুদূষণ রোধে অনেক দিন থেকে কাজ হচ্ছে। বায়ুদূষণ বাড়ার কারণ নির্ণয়ে নতুন জরিপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বায়ুর পাশাপাশি পরিবেশের সব ধরনের দূষণ কার্যক্রম সম্পর্কে জরিপ করা হবে। দূষণ রোধে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, তবে তা অবশ্যই দেশের উপযোগী হতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাহলেই দূষণ রোধে ফল মিলবে।

বার্তাবাজার/ডব্লিও.এস

বার্তা বাজার .কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
এই বিভাগের আরো খবর