সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ১৯৩টি বধ্যভূমি থেকে ৩৫টি বাছাই করে সেখানে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। তবে সংস্কারের অভাবে বেশিরভাগ বধ্যভুমির বেহাল দশা। অধিকাংশ বধ্যভূমিতে যাতায়াতের রাস্তা নেই। ময়লা-আবর্জনার স্তূপে এক রকম ঢাকা। সারাবছরই অধিকাংশ বধ্যভূমি থাকে মাদকসেবীদের দখলে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পৃক্ততার অভাবে অনেকেই বধ্যভূমিগুলোর ইতিহাসই জানেন না। এ ছাড়া নামফলক ও যুদ্ধে স্থানীয় শহীদদের নামও উল্লেখ
নেই বেশিরভাগ বধ্যভূমিতে। প্রকল্পপরবর্তী সময়ে স্মৃতিস্তম্ভগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সংস্কারে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে ৩৫টি বধ্যভূমিতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এই ৩৫টি বধ্যভূমির অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হয়েছে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডির এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে গণপূর্ত বিভাগ। তবে এসব স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শেষে রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি কোনো দপ্তরের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। যে কারণে অযতœ-অবহেলায় পড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভগুলো। আইএমইডির এক নিরীক্ষায় বিভিন্ন অসঙ্গতি উঠে এসেছে। কিন্তু সম্প্রতি এগুলোর বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ দেখা যায়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরিশালের সদরে রাস্তার মাপ না রেখেই নির্মাণ করা হয় বধ্যভূমি। রড ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে মূল স্মৃতিস্তম্ভ। এ ছাড়া নিম্নমানের ইট, বালু, সিমেন্ট ব্যবহার করার ফলে মূলস্তম্ভের টাইলস খুলে পড়েছে। বর্তমানে জরাজীর্ণ এই বধ্যভূমিতে কোনো ধরনের বাউন্ডারির কাজ করা হয়নি। ফরিদপুরের নগরকান্দায় অবস্থিত বধ্যভূমিটির অবকাঠামো দুর্বল হওয়ায় টাইলসগুলো খুলে পড়েছে। নির্মাণসামগ্রী ভালো না হওয়ায় কংক্রিটও খুলে পড়েছে।
যশোরের কালিতলার চাঁচড়ায় প্রস্তাবিত নকশা না মেনেই স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়। খুবই সংকীর্ণ এ জায়গায় কোনো ধরনের পতাকা বেদি পর্যন্ত স্থাপন করা হয়নি। অবকাঠামোগত কাজ খারাপ হওয়ায় একে স্মৃতিস্তম্ভ বলে বোঝা যায় না। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বধ্যভূমিতে সীমানাপ্রাচীরের কাজ বাকি রাখায় অবশিষ্ট দেয়াল খসে পড়েছে। মূলত বধ্যভূমিতে কোনো ফলক পর্যন্ত নেই। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় মূলস্তম্ভের নিচের দিকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বগুড়া সদরে বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভের মিনারটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মিনারের সব টাইলস খুলে পড়েছে। বর্তমানে এটি ময়লা আবর্জনার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কুমিল্লার রসুলপুরে সীমানাপ্রাচীরের মাপ ঠিক নেই। এ ছাড়া স্মৃতিস্তম্ভেরর টাইলস ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সীমানাপ্রাচীরও ভেঙে গেছে। কিশোরগঞ্জের দানাপাটুলির বধ্যভূমিতে কোনো সীমানাপ্রাচীরই নেই। নির্মাণ হয়নি স্মৃতিস্তম্ভের মিনার। এ বধ্যভূমিতে আসা-যাওয়ার কোনো রাস্তা না থাকায় পরিত্যক্ত হয়ে আছে। এ ছাড়া সীমানাপ্রাচীর না থাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। শেরপুরের ঝিনাইগাতি রোডের বধ্যভূমিতে আসা-যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। নীলফামারীর সৈয়দপুরের বধ্যভূমিতে কোনো কাজ করা হয়নি। স্থানীয়দের প্রভাবে নকশা ছাড়াই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এলাকাবাসী জানেনই না এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ। নির্ধারিত নকশার সঙ্গে কোনো মিল না থাকায় এর সীমানাপ্রাচীরও নির্মাণ হয়নি। হবিগঞ্জের বাহুবলে নিম্নমানের কংক্রিট থাকায় স্মৃতিস্তম্ভটির টাইলস খুলে পড়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নাটোরের ফুল বাগানে অবস্থিত বধ্যভূমি তুলনামূলক ভালো। দৃষ্টিনন্দন ও মূল সড়কের পাশে অবস্থিত বধ্যভূমিটি অবকাঠামোগতভাবে দুর্বলভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমির নির্মাণকাজ ভালো হয়েছে। জায়গার অভাবে অন্য বধ্যভূমির মতো একই নকশায় নির্মাণ সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আগামী প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে সে জন্য বধ্যভূমি নির্মাণ করা হবে। আগের বধ্যভূমি সংস্কারের পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের ২৭১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। এ জন্য ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। বধ্যভূমির বেহাল দশা সংস্কারে নতুন করে আবার প্রকল্প নেওয়া হলো। সম্পূর্ণ দেশজ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিত করে সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে। শহীদদের নামের তালিকাও টাঙানো হবে।
বার্তা বাজার/ডব্লিও.এস