আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী প্লাটিনাম জুট মিল শ্রমিক আব্দুস সাত্তারের (৫৫) জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) সকাল ১০টায় খুলনা প্লাটিনাম জুট মিল গেটে বিআইডিসি সড়কে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার লাশ পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় নিয়ে যান স্বজন ও সহকর্মীরা।
আব্দুস সাত্তারের ত্যাগকে শ্রদ্ধা জানিয়ে জানাজায় অংশ নেয়া শ্রমিকরা ঘোষণা দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এর আগে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অনশন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে শ্রমিক আব্দুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন- খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক সাবেক সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তরিকুল ইসলাম, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ ননসিবিএ সংগ্রাম পরিষদর যুগ্ম আহ্বায়ক মুরাদ হোসেন, হুমায়ুন কাবির, সোহরাব হোসেন, শ্রমিক নেতা কাওসার আলী মৃধা, খলিলুর রহমান, সেলিম আকন, সেলিম শিকদার, মনিরুল ইসলাম শিকদার, আবু হানিফ, শাহাজান সিরাজ, তরিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও মিন্টু মিয়া, স্টার জুট মিলের আবু হানিফ, তবিবর রহমান, আলমগীর হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, লিয়াকত হোসেন, আব্দুল হামিদ, হারুন অর রশিদ, আলাউদ্দিনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত শ্রমিক।
এদিকে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে শ্রমিক আব্দুস সাত্তারের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে তার পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। বৃহস্পতিবার রাতে খুলনার বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় পাটকল শ্রমিকদের অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মৃত শ্রমিকের পরিবারকে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ও খুলনা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনশনরত শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল টিম গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল করপোরেশনের শ্রমিকদের জন্য সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি কমিশন ২০১৫ বাস্তবায়নে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ১৫ই ডিসেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করেছে।
সভা থেকে শ্রমিকদের মজুরি কমিশন বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মজুরি কমিশন বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করতে ১১০৩ কোটি টাকার প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পাটকলগুলোর পণ্য বিক্রি করে এ অর্থ সংস্থান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে গত সপ্তাহে একশ’ কোটি টাকা দিয়ে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলমান ধর্মঘটের কারণে ছাঁটাই এবং বরখাস্ত শ্রমিকদের পুনর্বহাল করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী অনশন ও ধর্মঘটে থাকা শ্রমিকদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে কাজে ফেরার আহ্বান জানান।
তবে শ্রমিকরা কাজে ফিরে না গিয়ে গতকালও আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। উত্তাপ আর তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে শ্রমিকদের চতুর্থদিনের আমরণ অনশন কর্মসূচি। অনশনের কারণে অসুস্থ হয়ে অনেক শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শ্রমিক নেতারা জানান, খুলনার বিভিন্ন পাটকলের অন্তত দুই শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে ৪০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্টার জুট মিল নন সিবিএ সহসভাপতি বাচ্চু ব্যাপারী বলেন, আমাদের ২৬ জন সহকর্মী হাসপাতালে আছেন। আর প্যান্ডেলে শতাধিক শ্রমিক স্যালাইন নিয়ে আছেন।
প্লাটিনাম জুট মিলের সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, মিলের ৮০ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সহসভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, আমরা না খেয়ে রাজপথে আন্দোলন করছি। আর প্রশাসন আমাদের নিয়ে তামাশা করছে। দাবি বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদর যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান বলেন, শীত এবং অনাহারে থাকায় অসুস্থ হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন জানান, তার মিলের ১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ১৫ জনের স্যালাইন চলছে।
গত ১৭ই নভেম্বর ১১ দফা দাবিতে ৬ দিনের কর্মসূচির ডাক দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ। গত ২৫শে নভেম্বর থেকে কর্মসূচি শুরু হয়। আর ১০ই ডিসেম্বর শুরু হয় আমরণ অনশন। খুলনার ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ণ, আলিম এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং স্ব-স্ব পাটকলের উৎপাদন বন্ধ রেখে মিলের সামনের রোডে এ কর্মসূচি পালন করছেন শ্রমিকরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবং মৃত্যু হলেও তারা কর্মসূচি ছেড়ে যাবে না বলে জানান শ্রমিকরা।
কর্মসূচি চলাকালে খালিশপুরস্থ ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দিঘলিয়ার স্টারসহ খুলনা-যশোর অঞ্চলের পৃথক সমাবেশে বক্তৃতা করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ ননসিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মুরাদ হোসেন, শাহানা শারমিন, হুমায়ুন কাবির, মো. সোহরাব হোসেন, শ্রমিক নেতা কাওসার আলী মৃধা, মো. খলিলুর রহমান, সেলিম আকন, সেলিম শিকদার, মনিরুল ইসলাম শিকদার, মো. আবু হানিফ, সাহাজান সিরাজ, মো. তরিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও মিন্টু মিয়া, স্টার জুট মিলের আবু হানিফ, তবিবর রহমান, আলমগীর হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, লিয়াকত হোসেন।
আলিম ও ইস্টার্ণ জুট মিল শ্রমিক কর্মচারীদের অনশন চলাকালে ইস্টার্ণ জুট মিল সিবিএ সভাপতি মো. আলাউদ্দিনের সভাপতিত্বে আলিম জুট মিল সাবেক কোষাধ্যক্ষ মো. আমিরুল ইসলাম ও ইস্টার্ণ জুট মিলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলামের পরিচালনায় বক্তৃতা করেন, আলিম সিবিএ সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম লিটু, সাধারণ সম্পাদক আ. হামিদ সরদার, মো. ইউসুফ আলী, আলমগীর হোসেন, আ. হক মহলদার, হাফেজ আ. সালাম, আমিরুল ইসলাম, ইজদান আলী, মোজাম্মেল হক, হাসান শরীফ, আ. রব মোল্লা, আ. রশিদ, আকসার আলী, আ. মজিদ মোল্যা, শেখ জাকারিয়া, সর্দার আনোয়ার হোসেন, মেহেদি হাসান বিল্লাল, মনিরুল ইসলাম আকুঞ্জি, শেখ শামিমুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, ইদ্রিস আলী, আলতাফ হোসেন, হাফিজুর রহমান, বদর উদ্দিন বিশ্বাস, নাজমুল হক, কমরেড মফিদুল ইসলাম, গৌতম কুমার দাস, মোজাম্মেল হক, আব্দুস সত্তার মোল্যা, মো. বাবুল রেজা, মকবুল হোসেন, আবুল হাসান প্রমুখ।
এদিকে, অনশন কর্মসূচির কারণে পাটকলগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বিআইডিসি সড়কের দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে। পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনে খুলনার শিল্পাঞ্চল উত্তাল হয়ে পড়েছে। অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে গোটা শিল্পাঞ্চলে।
অপরদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের ১১ দফা দাবিতে আমরণ অনশনরত শ্রমিকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সম্মিলিত নাগরিক পরিষদ খুলনার উদ্যোগে এক সংহতি সমাবেশ গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ে অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক এডভোকেট কুদরত-ই-খুদার সভাপতিত্বে এবং খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদারের পরিচালনায় অন্যদের মধ্যে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন- গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সিপিবি নেতা জলি তালুকদার, সিপিবির কেন্দ্রীয় সদস্য এসএ রশীদ, খুলনা নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট আ ফ ম মহসীন, নারী নেত্রী রোজী রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দেলোয়ার উদ্দিন দিলু, মহানগর সভাপতি শেখ মফিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক এসএম ফারুখ-উল-ইসলাম, মহানগর সিপিবি নেতা মিজানুর রহমান বাবু, পরিবেশ সুরক্ষায় উপকূলীয় জোটের সদস্য সচিব এসএম ইকবাল হোসেন বিপ্লব, ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক এমএ কাশেম, বাসদের জেলা সমন্বয়কারী জনার্দন দত্ত নাণ্টু, বৃহত্তর আমরা খুলনাবাসীর সভাপতি ডা. নাসির উদ্দিন, আইন ও অধিকার বাস্তবায়ন ফোরামের খুলনা বিভাগীয় সভাপতি এসএম দেলোয়ার হোসেন, খুলনা উন্নয়ন আন্দোলনের চেয়ারম্যান শেখ মো. নাসির উদ্দিন, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব আফজাল হোসেন রাজু, শিক্ষক নেতা নিতাই পাল, টিইউসির জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম চন্দন, টিইউসি নেতা রুস্তম আলী হাওলাদার, জাতীয় যুব সংহতি খুলনা মহানগর সভাপতি শেখ মো. তোবারেক হোসেন তপু, সাংবাদিক ওয়াহিদুজ্জামান বুলু, দেশবাংলা একাডেমির সভাপতি এডভোকেট মেহেদী ইনছার, সুজনের ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বাবলু, ক্ষেতমজুর সমিতির কিংশুক রায়, জেলা যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত মুখার্জী, ছায়াবৃক্ষের মাহবুব আলম বাদশা, আ. হালিম, সিডিপির এসএমএ রহিম, অনশনরত শ্রমিক শহিদুল ইসলাম, মধু আক্তার মারিয়া, প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ, পে-কমিশন, মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ১১ দফা দাবি মেনে নিতে হবে। অন্যথায় সকল শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। মৃত্যুর মিছিলে আর কোনো নতুন মুখ দেখতে চাই না।
বার্তা বাজার/ডব্লিও.এস