চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দারা হাতির আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। উপজেলার কলাউজান, চরম্বা ও চুনতি ইউনিয়নের পাহাড়বেষ্টিত এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ আছেন সম্পদ নষ্টের ভয়ে।
গত শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত হাতির তাণ্ডবে মারা গেছেন দু’জন। তারা হলেন, নুরুল আলম (৩৮) নামের এক কৃষক ও শাহাব উদ্দিন (৫৫) নামের এক পাহারাদার।
লোহাগাড়ার তিনটি ইউনিয়নে হাতির দল ভাংচুর করেছে ২০টি ঘরবাড়ি। পাকা আমন ধান খেয়ে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ক্ষতি করে গেছে দলটি। এখনো উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই আক্রমণ করছে বন থেকে আসা হাতিগুলো।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত রোববার ভোরে উপজেলায় এ বছর প্রথম হানা দেয় হাতির একটি দল। চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা এলাকায় পাকা আমন ধান খেতে এসে কাদায় আটকে যায় একটি হাতি। পায়ে গ্যাংগ্রিনে (পচনশীল ঘা) আক্রান্ত থাকায় সেটি অন্য হাতিদের সঙ্গে যেতে পারেনি। গত মঙ্গলবার হাতিটি মারা যায়।
সঙ্গীর মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে দল বেধে আবার হাতিগুলো আক্রমণ করে স্থানীয় কৃষকদের আমন ক্ষেতে। পাকা ধান খেয়ে, ক্ষেত নষ্ট করে চলে যায় হাতির দলটি।
এর আগে গত ২১ নভেম্বর ভোরে বান্দরবান থেকে লোহাগাড়া-কলাউজান সীমান্তে লম্বাদিঘীর পাড় এলাকায় হানা দেয় হাতির একটি দল। ধানের ক্ষেতে হানা দিয়ে লাখ লাখ টাকার ফসল নষ্ট করে রাতেই উপজেলার আমিরাবাদ সুখছড়ী ও চরম্বা মাইজবিলা হয়ে বান্দরবানের বনাঞ্চলে চলে যায়। এ হাতির দলে ১৪টি হাতি ছিল বলে স্থানীয়রা জানান।
গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চরম্বা ইউনিয়নের মাইজবিলা এলাকার লোকালয়ের পাকা আমন ধানের ক্ষেতে আবার হানা দেয় হাতির একটি দল। এ সময় ধান রক্ষায় হাতি তাড়াতে গিয়ে নিহত হন নুরুল আলম। হাতির আক্রমণে নষ্ট হয় আজু মিয়া (৬০), মোক্তার আহমদ (৪০), রোফাইয়া বেগম (৩৮), জেসমিন আক্তার (৩৭) ও তফুরা খাতুনসহ (৬০) আরও পাঁচজনের ঘরবাড়ি।
গত রোববার গভীর রাতে চরম্বা ইউনিয়নের মাইজবিলা মধুফকির পাড়ার লোকালয়ে ঢুকে ফের আক্রমণ চালায় হাতিগুলো। এ সময় আবদুস শুক্কুর (৪৮), আবদুর রহিম (৩৮), সাদ্দাম হোসেন (২৮) ও মরিয়ম বেগম (৪৫), রাবেয়া বেগম (৪০), নাছিমা আক্তার (৩৫), আবদুল গফুর (৩৮), ও আবু ছালেকের (২৯) আটটি ঘরবাড়ি ভাংচুর করে যায়।
একই রাতের ১১টার দিকে উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা মংডুলার চর এলাকায় ১৮টি হাতি দল বেধে ধান ক্ষেতে হানা দেয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন পদুয়া বন রেঞ্জের ডলু বনবিট কর্মকর্তা মোবারক হোসেন।
মোবারক জানান, রাত ১১টার দিকে লোকালয়ে প্রবেশ করে ডলু বিটের আওতাধীন সুফল প্রকল্প নামের একটি নার্সারীর প্রায় ৯-১০ হাজার গাছের চারা নষ্ট করে হাতির দলটি। ক্ষেতে ঢুকে পাকা ধান খেয়ে ফেলে।
গত সোমবার গভীর রাতে হানা দিয়ে আবদুর রহিম (৩৫) ও দিলোয়ারা বেগম (৩৮) নামের দুই বাসিন্দার বসতঘর ভাংচুর করে হাতির দল। গত মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে উপজেলার উত্তর কলাউজান এলাকায় একদল বন্যহাতি হানা দিয়ে তাণ্ডব চালায়। এ সময় ওই এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ব্রিজের পাহারাদার শাহাব উদ্দিন হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করলে তাকে শুঁড় দিয়ে ধরে পায়ে পিষ্ট করে হত্যা করে। এ ছাড়া চরম্বা মাইজবিলা এলাকায় গভীর রাতে ধানক্ষেত ও ফসলি জমিতে ঢুকে ব্যাপক ক্ষতি করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন চরম্বা ইউনিয়নের মাইজবিলা ৭ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার জয়নাল আবেদীন।
জয়নাল জানান, বিভিন্ন এলাকাসহ তাদের ওয়ার্ডে গভীর রাতে হানা দিয়ে এখন পর্যন্ত অর্ধ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে হাতিগুলো।
এদিকে, সন্ধ্যা নামলেই হাতির দল পাকা আমন ধান খাওয়ার জন্য বন থেকে লোকালয়ে চলে আসছে। হাতির আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে ওইসব এলাকার লোকজন।
চুনতি পানত্রিশার স্থানীয় কৃষক আবদুর রশিদ জানান, হাতির পাল দিনের বেলায় পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিলেও সন্ধ্যার পর দল বেঁধে চলে আসে ধান ক্ষেতে। এলাকায় বন্যহাতির পাল প্রতি রাতেই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। ধানক্ষেতে ঢোকার আগে স্থানীয় কৃষকরা আলো জ্বালিয়ে, পটকা ফাঁটিয়ে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ধানক্ষেত রক্ষা করতে কৃষকরা প্রতিদিন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে তাদের পাহারা দিতে হচ্ছে। বন বিভাগের কার্যকরী কোনো ভূমিকা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ওই এলাকার কৃষকরা।
চুনতি পানত্রিশা চাম্বি খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির সভাপতি মাস্টার মাহবুবর রহমান ঘটনাগুলো সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘গ্রামের প্রায় মানুষ এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই গ্রামে হাতি ঢুকে ফসলের বিভিন্ন ক্ষেতে তাণ্ডব চালানোর আশঙ্কাকরছি। প্রাণের ভয়ে পাহাড়ি এলাকার জমিগুলোতে কৃষকরা চাষাবাদ বন্ধ করে দিতে পারে।’
চুনতি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জনু বলেন, ‘হাতি মারার নিয়ম নাই। ভয় দেখিয়ে তাদের বনে ফেরত পাঠানোর জন্য এলাকাবাসীকে সচেতন করা হয়েছে। বনবিভাগ ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে ফরম পাঠিয়েছে এবং আমরা সেভাবে কাজ করছি।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মনজুরুল আলম বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে অবগত আছি। সত্যি কথা বলতে ক্ষেতে ধান পাকলে ফসলি জমিতে পাহাড়ি হাতির আনাগোনা বেড়ে যায়। হাতিদের বিরক্ত না করলে হাতিরা সচরাচর মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক হয় না। হাতিরা যে পরিমাণ ফসলের ক্ষতি করবে তা নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপ‚রণ দেওয়ার সরকারি বিধান আছে।
বার্তা বাজার/ডব্লিও.এস