হাইওয়ে পুলিশ হলো হাইওয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট। হাইওয়ে পুলিশ রেঞ্জের প্রধান কর্মকর্তা হলেন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (হাইওয়ে পুলিশ)।
মহাসড়কে যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে অপরাধ দমন এবং ডাকাতি ছিনতাই প্রতিরোধে বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পুলিশের এই বিশেষ বাহিনীর ইতিবাচক ভূমিকার জন্যই হাইওয়ে পুলিশ এখন মহাসড়ক নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সেই আমিনবাজার থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকার মহাসড়কের দায়িত্ব সাভার হাইওয়ে থানার। বর্তমান অফিসার ইনচার্জ মোঃ আব্দুল্লাহিল বাকী গত ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে যোগদান করেছেন। মূলত একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েই তিনি এই সাভার হাইওয়ে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন।
বার্তা বাজারকে ওসি আব্দুল্লাহিল বাকী নিজেই জানালেন সেই চ্যালেঞ্জের কথা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাভার হাইওয়ে থানায় আমি যোগদানের পূর্বে আমাকে আমার কর্তৃপক্ষ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা আমাকে বলে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে আমিনবাজারের ট্রাক স্ট্যান্ডের কথা, যেটার কারণে নিত্যদিন বেশ বড় ধরণের যানজটের কবলে পড়তে হয়। এছাড়া, হেমায়েতপুরে রাস্তার পাশে দোকানদারদের অবৈধ দখলদারি, সাভার বাজার স্ট্যান্ডে রাস্তার উভয় পাশের অবৈধ দখলদারি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল এলাকায় জিরাবো সংযোগ সড়কে সৃষ্ট যানজট, আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় নিত্যদিনের জ্যাম, মহাসড়কে যেকোনো ধরণের থ্রি-হুইলার চলাচলের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি।
সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ আরও জানান, আমি যোগদান করার পরে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কাজ শুরু করি। প্রতিদিন সকালে আমার অফিসারদের ও সঙ্গীয় ফোর্সদের নিয়ে সারাদিন ওই সব স্পটে অভিযান পরিচালনা করি। শুরুটা করেছি এবং এই অল্পসময়ে নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষ আগের থেকে পার্থক্যটা অনুভব করতে পারছেন। যানজট অনেক কমে গেছে, পাশাপাশি কমেছে দূর্ঘটনার হারও। আশা করছি এভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারলে আমার কর্তৃপক্ষ যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমাকে পাঠিয়েছেন তা ইনশা আল্লাহ শেষ করতে পারবো।
সরেজমিন আমিনবাজার ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে ট্রাক স্ট্যান্ড মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া সাভার বাজার বাস স্ট্যান্ড, সিএন্ডবি মোড়, বিশমাইল এলাকা, নবীনগর ও বাইপাইল এলাকা ঘুরে সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ এর আশাবাদ এর ইতিবাচক রুপায়ন দেখা গেছে। এসব জায়গায় যানজট আগের চেয়ে অনেক কম। ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ফুটপাতের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান হাইওয়ে থানার কর্মকর্তাদের কাজকে আরো কিছুটা সহজ করেছে।
একসময় সিএন্ডবি মোড়ে আশুলিয়া বাজারগামী যানবাহনের অনিয়মতান্ত্রিক পার্কিং ও যত্রতত্র থেমে যাত্রী ওঠানো-নামানোয় নিত্যদিন জ্যামে যাত্রীদের দূর্বিষহ অবস্থায় পড়তে হতো। সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশমাইল গেট এলাকায় মর্ণিং গ্লোরি স্কুলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যাতায়াত, স্কুল ছুটির সময়ে ফিরে আসা সহ জিরাবো অভিমূখী অসংখ্য যানবাহনের ভীড় এক নারকীয় যানজটের সৃষ্টি করতো। নবীনগরের জ্যাম ও ছিলো দূর্বিষহ এবং বাইপাইল মোড়ের জ্যাম সেই ইপিজেড পার হয়ে শ্রীপুর এবং বাইপাইল থেকে আশুলিয়া বাজারগামী সড়কের জ্যাম কখনও কখনো নরসিংহপুর ছাড়িয়ে জিরাবো পর্যন্ত বিস্তৃত হতো।
সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আব্দুল্লাহেল বাকী দায়িত্ব গ্রহন করার পরে তার অধীনস্থ কর্মকর্তা ট্রাফিক সার্জেন্ট সোহাগ এবং অরবিন্দ সেন সহ অন্যদের সাথে নিয়ে দিনভর নিজস্ব উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনায় নানাবিধ কর্মকান্ড দ্বারা ওই সকল জায়গার ট্রাফিক জ্যাম যেমন অনেক কমিয়ে এনেছেন, পাশাপাশি কমেছে দূর্ঘটনার হার।
বিশেষ করে, বাইপাইলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বাইপাইল ব্রিজ এলাকায় লোকাল গাড়িগুলিকে মহাসড়কে পার্কিং সহ স্টপেজ করতে না দিয়ে বিকল্প বেইলী ব্রিজ দিয়ে লোকাল লেইন অভিমূখী চলার প্রবণতা তৈরী এই এলাকার যানজট এজদম নাই হবার প্রধাণ কারণ বলা যেতে পারে। আর এই কাজটিও সম্পন্ন হয়েছে সাভার হাইওয়ে থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ এর দূরদর্শীতা ও আইন মানানোর ব্যাপারে কোমলে-কঠোরে মিলানো একাগ্রতার ফলে।
বাইপাইল ব্রিজ এলাকায় এরকম এক অভিযান চলাকালে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ এর সাথে। তিনি জানান, নতুন যে সড়ক পরিবহন আইন হয়েছে, সে আইনটা বাস্তবায়নে এখনও অতটা কড়াকড়ির দিকে না যেয়ে আমরা মূলত যেটা করছি তাহলো, সাধারণ যাত্রী, চালক ও পথচারীদের সচেতন করা। তাদেরকে আইন সম্পর্কে জানানো এবং বোঝানোর কাজটিই করা হচ্ছে এই পর্যায়ে।
বাইপাইল এলাকার যানজট আগের চেয়ে কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক আগেই এখানে রোডস এন্ড হাইওয়ে থেকে একটি বেইলী ব্রিজ করে দেয়া আছে যা কেউ ব্যবহার করতো না। আমি যোগদানের পরে এটা ব্যবহার করার জন্য লোকাল বাসচালক এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করেছি। প্রথমদিকে তাদেরকে সিগন্যাল দিয়ে এই ব্রিজ দিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এখন তারা নিজেরাই এই বেইলী ব্রিজ ব্যবহার করে বিধায় মহাসড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামার কারণে আর জ্যাম হয় না।
এসময় মহাসড়ক ধরে চলাচলরত বেশ কয়েকজন থ্রি-হুইলার চালককে থামিয়ে তাদেরকে মহাসড়কে চলাচল করতে নিষেধ করতে দেখা যায় হাইওয়ে থানার অফিসার ও ফোর্সদের। তবে বারংবার নিষেধ অমান্য করায় কয়েকটি থ্রি-হুইলার ও এর চালকদেরকে আটক করা হয়। পরে তাদের বাহনগুলি র্যাকার দিয়ে হাইওয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই থ্রি-হুইলার চলাচল ও এদের কারণে সৃষ্ট দূর্ঘটনা সম্পর্কে সাভার হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার কোনোভাবেই চলাচল করতে পারবে না। কারণ মহাসড়কে যে গতিতে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও অন্য মাঝারি বাহনগুলি চলাচল করে, তাদের তূলনায় এই থ্রি-হুইলারগুলি অনেক কম গতিসম্পন্ন হওয়ায় এদের কারণেই মূলত দূর্ঘটনা ঘটে। এজন্য প্রথমে এসব চালকদেরকে সতর্ক করেছি; কিন্তু এরপরও নিষেধ অমান্য করলে তাদের বাহনগুলি জব্দ করা ছাড়া আর পথ থাকে না।
মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা কাঁচাবাজার সম্পর্কে ওসি মোঃ আব্দুল্লাহেল বাকী জানান, মহাসড়কের পাশে দীর্ঘদিন ধরে যেসকল কাঁচাবাজার গড়ে উঠেছে, প্রতিনিয়ত সেগুলো আমরা অপসারণ করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। যারা বসছেন তাদেরকে অনুরোধ করছি, সরিয়ে দিচ্ছি, লিফলেট বিলি করছি। তাদের ভিতরে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমেই মূলত এর অবসান সম্ভব, আমরা সেভাবেই কাজ করছি।
সাভার হাইওয়ে থানার রাতের টহল পেট্রোল টিমের কারণে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতি একদম নাই বললেই চলে। নাইট ডিউটিরত সাভার হাইওয়ে থানার ট্রাফিক সার্জেন্ট সোহাগ এবং অরবিন্দ সেন জানান, সিএন্ডবি এলাকা থেজে শুরু হয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএইচ গেট, ডেইরি গেট, প্রান্তিক গেট ও বিশমাইল গেট এলাকায় অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটতো। নিয়মিত ওই এলাকাগুলিতে নাইট পেট্রোল ডিউটির কারণে এখন আর ছিনতাইয়ের ঘটনা আগের মতো নেই।
তারা বার্তা বাজারকে আরো জানান, দূরপাল্লার নৈশ কোচগুলি বিভিন্ন স্পটে দূর্ঘটনা ঘটায়, হাইওয়ে থানার নাইট পেট্রোল ডিউটিরত সদস্যদের কারণে এসব দূর্ঘটনায় আহত অনেকের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাদেরকে বাঁচানো সম্ভব হয়।
এব্যাপারে ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলাচলরত কয়েকটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী কোচ ও লোকাল বাস এর চালকদের সাথে কথা বললে তারা এই মহাসড়কে যানজট আগের চেয়ে অনেক কমেছে বলে জানান।
আশুলিয়ার সিএন্ডবি এলাকার নার্সারী ব্যবসায়ী মোর্শেদ আলম জানান, এই স্পটে হাইওয়ে পুলিশ বক্স স্থাপনের পরে এবং নতুন ওসি আসার পরে মোটামুটি দায়িত্ব ভালোই পালন করছেন। যানজট এখন তেমন একটা নাই বললেই চলে। তবে এই সিএন্ডবি এলাকায় একটি ওভারব্রিজ হলে আরো ভালো হতো।
তাই সার্বিকভাবে বলা চলে, সাভার হাইওয়ে থানার বর্তমান চৌকস অফিসার ইনচার্জ ও তার টিম এর সদস্যদের একনিষ্ঠতায় বর্তমানে আমিনবাজার থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাট এবং নবীনগর থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা পর্যন্ত সাভার হাইওয়ে থানাধীন মহাসড়কে আগের চেয়ে তুলনামূলক স্বস্তি নিয়েই চলাচল করছে যানবাহন ও সাধারণ যাত্রীরা। কমছে ট্রাফিক জ্যাম ও দূর্ঘটনার হার। তবে সাধারণ যাত্রী, চালক ও হেল্পার সহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ নতুন সড়ক পরিবহন আইন যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ মানার অভ্যাস গড়ে না তুলতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মহাসড়কে চলাচল প্রক্রিয়া নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে না বলে অভিমত বিশ্লেষকদের।
ভিডিও আসছে….
বার্তাবাজার/এমকে