ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেন অনেকেই, কিন্তু সেটাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন কজন! বিজ্ঞানী ও ভারতের রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আবদুল কালাম বলেছিলেন, স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখ, স্বপ্ন সেটাই যেটা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।
একটু চিন্তা করলেই কথাটির মূল্যবান মর্ম আপনিও বুঝতে পারবেন। জীবনে আমাদের অনেক চড়াই উতরাই পার করতে হয়। এতে জীবন থেমে থাকে না। ধৈর্য্য আর ইচ্ছাশক্তি আপনাকে পৌঁছে দেবে সাফল্যের উচ্চ শিখরে। এরজন্য চমৎকার উদাহরণ ইশরাত জাহান নিপা।
যিনি স্নাতকোত্তর শেষ করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। তবে ২০১২ সালে সাংবাদিকতা তাকে ছেড়ে দিতে হয়। অফিসিয়াল কিছু ঝামেলার কারণে তিনি ওই সময় ছুটি পাননি, যে কারণে তার একটা গর্ভপাত হয়। ফলে তার মধ্যে একটা অভিমান এবং কষ্ট কাজ করে। এরপরই তিনি এ পেশায় আর থাকবেননা বলে মনস্থির করেন। চাকরি ছেড়ে প্রথমে ক্যাটারিং সার্ভিস চালু করেন। একজন উদ্যোক্তা হওয়ার কাজ শুরু করেন ইশরাত জাহান। যিনি আরিয়ানা’স কিচেন ক্যাটারিং এবং এ.আর.এস ফুডের পরিচালক।
খাবারের প্রতি ইশরাতের বরাবরই আকর্ষণ ছিল পাশাপাশি। তার বন্ধুরাও তাকে বেশ উৎসাহিত করেছে। তিনি যেহেতু রান্না ভালো পারেন এবং এতে বেশ আগ্রহ রয়েছে। তাই তার কাছের বন্ধুরাই তাকে পরামর্শ দেয় রান্না নিয়ে কিছু করতে। এরপর তিনি বাংলাদেশ কর্পোরেশন থেকে এক বছরের শেফ কোর্স করেন। ওই কোর্স চলা অবস্থায় একটি অফিসে দুপুরের খাবার দেয়ার কাজ পেয়ে যান। ছোট্ট একটি গৃহপরিচারিকার সাহায্য নিয়ে খাবারগুলো তার বাসাতেই রান্না করতেন। যখন অফিসগুলোতে তিনি খাবার দেয়া শুরু করলেন তখন অনেকেই তাকে বুয়া বলা শুরু করল। সেসময় পরিচিত অনেকেই যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। একজন মাস্টার্স পাশ করা মেয়ে হয়ে বাবুর্চির কাজ করছে। এটা দেখতে ভালো লাগেনি কারোই। সমাজের সঙ্গেও যায় না।
আমার প্রথম বিনিয়োগে টাকার পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার টাকা। সেটা দিয়ে আমি টিফিন বক্স এবং আরো অনেক কিছু কিনে আমার শুরু। আর এখন ক্যাটারিং সার্ভিসসহ আমার তিনটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যার মূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকার মতো। কথাগুলো ইশরাত জাহান নিপার।
মাত্র ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে ঢাকার মহাখালীতে প্রথম রেস্টুরেন্ট চালু করেন ইশরাত জাহান। যাত্রার শুরুটা ভালো হলেও, সব সুন্দর তো আর ভালো হয় না। কিছুদিন পর তিনি গর্ভধারণ করলে কর্মচারীদের উপর রেস্টুরেন্টের দায়িত্ব দেন। তবে কর্মচারীদের অবহেলায় তার ব্যবসাটা নষ্ট হয়ে যায়। এরপর তিনি মহাখালী থেকে ৩০০ ফিটে চলে আসেন। এখানে প্রথমে কাবাবের দোকান দিয়ে শুরু করলেও পরে আরো একটি পিজ্জা পাস্তার দোকান দেন। মূলত তার রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ঢালাও ভাবে শুরু এখান থেকেই। এ জায়গার ফুটকোর্টগুলোর মালিকদের মধ্যে তিনিই একমাত্র মেয়ে। রেস্টুরেন্ট থেকে ভালো লাভ হওয়ায় পরবর্তীতে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে আরো একটি রেস্টুরেন্ট দেন। এখন ক্যাটারিং সার্ভিসসহ ইশরাত জাহানের তিনটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যার মূল্যমান প্রায় ২৫ লাখ টাকার মতো।
বর্তমানে তিনি দুটি সন্তানের জননী। একটি ছেলে, অন্যটি মেয়ে। ইশরাতের দিন শুরু হয় ভোর পাঁচটায় নামাজ পড়ে। এরপর বাচ্চাদের টিফিন গুছিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে চলে যান তার বাংলা রেস্টুরেন্টে। দুপুরে কিছু সময়ের জন্য বাসায় যান। এরপর সন্ধ্যা থেকে তাকে অন্য রেস্টুরেন্টগুলোতে সময় দিতে হয়।
ব্যবসার উত্থান পতনও দেখেছেন ইশরাত জাহান। পাঁচ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে দুবার দোকান পুড়েছে। ব্যাংক ঋণ আর বন্ধু বান্ধবদের সহযোগিতায় আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কখনো কখনো ভেঙ্গেও পড়েছেন। ইশরাত বলেন- যতোটা না ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তার থেকে বেশি হচ্ছেন মেয়ে হিসেবে। ব্যবসা করতে এসে অনেকবার হোঁচট খেয়েছেন তিনি। এমনকি সামনে আরো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাও তিনি বুঝতে পারেন। সেসব কিছুকে পাত্তা না দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছেন তিনি।
লোকসান করার পর লাভের মুখ দেখেছেন আবার লোকসানও করেছেন অনেকবার। তাই এখনো তিনি নিজেকে পুরোপুরি সফল বলতে চান না। তবে সফল হবার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন তিনি। দারুণ ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য্য এবং আত্নবিশ্বাস তাকে এই পর্যায়ে এনেছে।
বার্তাবাজার/কে.জে.পি