দেশের সুনামধন্য ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান দর্শনার কেরুজ চিনিকলের গোডাউনে প্রায় নষ্ট হওয়া সাড়ে ৩৪ কোটি টাকার চিনি অবশেষে বিক্রি করেতে সক্ষম হয়েছেন চিনিকল কর্তৃপক্ষ। বাজার দরের কিছুটা কমদামে বিক্রি করলেও বড় ধরণের লোকশানের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে চিনিকলটি।
জেলার একমাত্র ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানী চিনিকল। দীর্ঘ ৮১ বছর ধরে নানা প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে চিনি ভিনেগার এবং এলকোহল উৎপাদন করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠনটি। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন এবং চিনিকল কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও চিনিকলের গোডাউনে রক্ষিত চিনি কোনভাবেই বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে চিনি উৎপাদনে লোকশান ঠেকাতে পারছে না মিলটি। দিন যতই গড়াচ্ছে চিনি উৎপাদনে লোকশানের বোঝা ততই ভারি হচ্ছে। কোন ভাবেই লোকশান নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিগত দিনের ৬৫ কোটি টাকা লোকশানের বোঝা মাথায় নিয়ে চিনিকলটির চলতি মাড়াই মৌসুম শুরু হয়েছে। এবারের মাড়াই মৌসুম শুরুর আগে থেকেই গোডাউনে প্রায় ৯ হাজার মেট্রিক টন চিনি মজুত ছিলো। চিনিকলের সূযোগ্য ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আলী আনছারীর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা ও অনন্য দক্ষতায় গোডাউনে প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া উক্ত পরিমান চিনি বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ।
বাজার দরের কিছুটা কমদামে বিক্রি করলেও বড় ধরণের লোকশানের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে চিনিকল প্রতিষ্ঠনটি। মৌসুম শুরুর আগে এ চিনি বিক্রি করতে না পারলে রাখার অভাবে যেমন নষ্ট হতো তেমনি লোকশানের পাল্লা হতো ভারী। চিনি উৎপাদন বিভাগে প্রতিবছরই এভাবে লোকশান করতে থাকলে জেলার একমাত্র ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠনটি হুমকির মুখে পড়বে বলে বিজ্ঞজনেরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের শিল্প স্থাপনা গুলোর মধ্যে কেরু এ্যান্ড কোম্পানী (বাংলাদেশ) লিঃ একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। ১৯৩৮ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী জনপদ শিল্পশহর দর্শনায় চিনিশিল্প, ডিষ্টিলারী ও বানিজ্যিক খামারের সমন্বয়ে এ বৃহৎ শিল্প কমপ্লেক্সটি গড়ে ওঠে। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় করণ করা হয়। তখন থেকে অদ্যবদি এটি কেরু এ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিঃ নামে বাংলাদেশ সুগার এ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।
কেরুজ চিনিকল সুত্রে জানাগেছে, স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এ প্রতিষ্ঠনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ৬ জন। এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯ জন কর্মকর্তা। জনশ্রুতি রয়েছে দায়িত্ব নিয়ে যোগদানের পর থেকে নিজেস্ব কারিশমা প্রতিষ্ঠা করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন চিনিকলটিতে বিগতদিনে দায়িত্ব পালনরত ব্যবস্থাপনা পরিচালকগন। কিছু দিন দায়িত্ব পালন শেষে কেউ গেছেন সাফল্যের বরমাল্য পরে, আবার কেউ গেছেন শূণ্যহাতে। কেউ গুছিয়েছেন নিজের আখের আবার কেউ কাজ করেছেন চিনিকলের স্বার্থে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগন বিদায়ের পর প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টরা অনুধাবন করেন দায়িত্ব পালনকারি কর্মকর্তা মেধা শ্রম দিয়েছেন প্রতিষ্ঠনের জন্য না নিজের জন্য। এ সবের ধারাবাহিকতায় ৬৫ কোটি টাকা লোকশানের বোঝা মাথায় নিয়ে গত ২৯ নভেম্বর ২০১৯-২০ মাড়াই মৌসুম শুরু করে প্রতিষ্ঠনটি। এর আগে গোডাউনে চিনি মজুদ ছিলো ৬ হাজার ৬শ মেট্রিক টন। যা এবার একসাথে ৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। নির্ধারিত মূল্যের চাইতে কিছু কম হলেও একদিকে যেমন বড় ধরণের লোকশানের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, তেমনি ভাবে অর্থ নৈতিক ভাবে লাভবান হয়েছে প্রতিষ্ঠনটি।
নিম্নমানের চিনি উৎপাদনের কারণে গোডাইনে প্রতি বছর নষ্ট হয় চিনি। আগের বছর গুলির রক্ষিত চিনির সাথে চলতি মৌসুমের চিনি রাখা নিয়ে কর্তৃপক্ষের যখন রীতিমত ছেড়ে দেমা কেদে বাচি’র মত অবস্থা, ঠিক সে সময়েই চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব জাহেদ আলী আনছারী বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনকে জানিয়ে প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া চিনিগুলি বিক্রি করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে এককালীন ৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার চিনি নগদ বিক্রি করতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। এর আগের তিন মৌসুমের নষ্ট হওয়া চিনি মাত্র ২৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হয়ে ছিলো এ প্রতিষ্ঠনকে।
একটি সূত্র, জানিয়েছে বিগত ১০ বছর ধরে এ চিনিকলটি খবুই নিম্নমানের চিনি উৎপাদিত করে আসছে। যার ফলে উৎপাদিত চিনি ৬ মাসের বেশি রাখলে তা শক্ত হয়ে দানা বাঁধে এবং সেই সাথে গলতেও শুরু করে। পরে সে চিনি আর ব্যাবহারের উপযোগি থাকে না। সূত্র আরও জানায়, বর্তমানের বিক্রিকৃত চিনি গুড় তৈরীর মালিকেরা কিনে নিয়েছে। কারণ এ চিনির রঙ এবং গুণগত মানের কারণে অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যায় না। সেই সাথে নতুন চিনি উঠলে পুরাতন চিনি কেউ কিনতে চাইবে না। বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনিয় পন্যের মধ্যে সব চাইতে চিনির মূল্যই কম। আর কেরুজ চিনির মান ভালো হলেও রঙের কারণে বাজারে এর চাহিদা কম। কোন ভোক্তায় কিনতে চাই না এ চিনি। বাজারে সাদা চিনির চাহিদা বেশি। যদিও সাদাচিনি মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চিনির গুণগত মান অটুট রাখতে এতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে চুন আর সালফার (গন্ধক)। চুনের কাছ হচ্ছে রসকে পরিষ্কার করা। আর হলুদ বর্ণের সালফার অ্যান্টিবায়োটিক এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল হিসাবে কাজ করে। বর্তমানে চুন এবং সালফার মানসন্মত কেনা হলেও অভিযোগ রয়েছে বিগত দিনে মানহীন চুন সালফার ক্রয় করে প্রতিষ্ঠানটি ।
এব্যাপারে চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের প্রধান রসায়নবিদ হামিদুল ইসলাম বলেন, আখ হচ্ছে চিনি উৎপাদনের প্রধান কাচামাল। আর সে কাচামাল থেকে উৎপাদিত হয় চিনি। মানমন্মত চিনি তৈরী হয়ে থাকে চুন এবং সালফারের মিশ্রনের কারণে। বিগত দিনে কি হয়েছে বলতে পারব না। তবে চলতি মৌসুমে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে পরিস্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছে চুনের গুণগত মান ৮০ শতাংশ এবং সালফারের গুণগতমান ৯৫ শতাংশ না হলে তা কোন ভাবেই গ্রহণ করা হবে না।
সরকারের অতিরিক্ত সচিব পদ মর্যাদার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান অজিত কুমার পাল বলেন, চিনি শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর চিনির বাজার মূল্য ছিলো ৫০ টাকা। সেখান থেকে চিনির দাম বাড়ানো হয়েছে। যাতে করে অসাধু মজুদদাররা মজুত করতে না পারে। নতুন চিনি উঠলে পুরাতন চিনি কেউ কিনতে চাইবে না। তাই নষ্ট হতে যাওয়া চিনি বিক্রি করে দেয়া হয়েছে।
এব্যাপারে কেরুজ চিনিকলের সূযোগ্য ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ আলী আনছারী বলেন, কয়েক বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে প্রতিষ্ঠনটিতে চিনি উৎপাদন কনা হচ্ছে। যার ফলে এখানকার চিনির বেসরকারি খাতে চাহিদা নেই বললেই চলে। আর এ চিনি ৬ মাসের বেশি সময় রাখা যায় না। পচে গলে নষ্ট হবার উপক্রম হয়। যে দামই নির্ধারণ করা হোক, তা যদি বিক্রি না হয় তাহলে তার কোন মূল্যই থাকে না। এদিকে মাড়াই মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। নতুন চিনি তৈরী হচ্ছে। নতুন চিনি এস গেলে পুরাতন চিনি কেউ কিনতে চাইবে না। মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথেই চিনিগুলো বিক্রি করতে পারায় প্রতিষ্ঠণটি বড় ধরণের লোকশানের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
বার্তা বাজার/ডব্লিও.এস